এম দিলদার উদ্দিনের গল্প : আমার বৌ পালিয়েছে

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২০

প্রতীকী ছবি

 


.

 এম দিলদার উদ্দিন

.

গুল্যাখালী গ্রামের জমিদার বাড়িতে আজ সকাল থেকেই হৈ চৈ কান্ড। নবাবীয়ানা বাবুর্চি আনা হয়েছে নোয়াখালী শহর থেকে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা ! তিনটি গরু, আট  টি খাসি, নিজের পুকুরের বড়ো বড়ো মাছের আয়োজন। ফযরের আগ থেকেই রান্না চলছে। হরেক রকমের পদ- পোলাও, গরুর ভুনা মাংস,খাসির মাংশ, মুরগীর রোস্ট, জর্দা পোলাও, দই, আরও কতোকি! পাত্র ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকায় বিদেশী একটি কোম্পানীতে চাকুরী করেন। বাড়ি তার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায়, আফাজিয়া এলাকার তালুকদার গ্ৰামে। বিয়ে উপলক্ষে বর ছুটি নিয়ে সপ্তাহ খানেক আগে নিজ বাড়িতে এসেছেন ঢাকাইয়া কয়েকজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে। আজ বিয়ের অনুষ্ঠান। দুপুর গড়িয়ে বিকাল চারটায়  একটি মাইক্রো আর ১০টি জীপ আর কয়েকটি হোন্দায় চড়ে আফাজিয়া থেকে বরযাত্রীরা এসে পৌঁছেছেন কনের বাড়িতে। প্রথমেই নানান পদের নাস্তা ও রূহঅফজা শরবৎ খাওয়ানো হল। এরপর বিয়ে পড়ানোর কাজও শেষ হল। কিছুক্ষণ পর মূল খাওয়ার আয়োজন শুরু হলো। দেখা গেল কয়েকজন খাবার খাচ্ছে ! অনেকেই না খেয়ে উঠে যাচ্ছে ! তারা বলছে- অতি ঘি মাখা পোলাও তারা খাবে না! গ্ৰামের মানুষ, তারা সাদা ভাত খেয়ে অভ্যস্ত। তৈলাক্ত ভাত তারা খাবেন না! সকাল থেকে গ্রামের দুই হাজার লোককে খাওয়ানো হয়েছে। তাই চেয়ার, টেবিল ও প্লেটে উচ্ছিষ্ট লেপটে রয়েছে। আবার শুরু হলো সাদা ভাত রান্না, চেয়ার,টেবিল প্লেট গ্লাস সাবান দিয়ে তৈলাক্ততা দূর করার কাজ। পরে সাদা ভাত পেয়ে তারা বড়ই খুশি। বর পক্ষ দুপুরের খাওয়া শেষ করতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। বিয়ে পড়ানোর পর দশ লক্ষ এক টাকার কাবিননামাও  সম্পন্ন হয়েছে। দর্শন পর্ব শেষে পাত্রপক্ষ পাত্রী নিয়ে নিজেদের বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ হৈ চৈ শুরু হলো অন্দর মহলে। কনে পালিয়েছে ! কনে তার প্রেমিকের হাত ধরে ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে কৌশলে পালিয়ে যেতে পারে বলে কেউ কেউ ধারনা করছেন। কারো কারো ধারনা এত নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে বাড়ি  থেকে কনে পালাতে পারে না। নিশ্চয় জ্বীনের আছর পড়েছে, জ্বীনে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। তাই টর্চ নিয়ে বাগান, পুকুর পাড়, বড় গাছের ডাল, ঘরের মাচাং সর্বত্র খোঁজা হয়েছে। কোথায়ও নেই। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতেও  খুঁজে কনেকে  পাওয়া যায়নি। কনের পলায়নের ঘটনায় কনে পক্ষের লোকজন মহা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়।

.

গুল্যাখালী গ্রামের জমিদার বাড়ির জয়নাল মিয়ার কন্যা আকলিমা আক্তার (১৮)-এর সাথে চরঈশ্বর তালুকদার গ্রামের মরহুম মনির মিয়ার পুত্র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমানের বিয়ের দিন ধার্য করা হয়। তাই আজ বিয়ের অনুষ্ঠান।  বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে কনের পলায়নে কনের অভিভাবকরা যতটা বিব্রত হয়েছেন তার চেয়ে বেশি বিব্রত হয়েছেন বর ও তার অভিভাবকরা। দু’পক্ষের মধ্যে এ নিয়ে তুমুল হুলুস্থুল পড়ে যায়। উভয় পরিবারের মাঝে বিয়ের আনন্দ হঠাৎ নিরানন্দে পরিনত হয়ে যায়। হঠাৎ যেন মারমুখী অবস্থা। দু’পক্ষই বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিয়ের আয়োজন করেছিলেন।  বর হাবিবের বড়ভাই আলমগীর কনেকে খুঁজে বের করে আনার জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং এক ঘন্টার সময় বেঁধে দেন। কনের পরিবারের লোকজন উপায়ান্তর না পেয়ে কনে আকলিমার বড় ভাই দাউদ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেছেন।

.

থানায় সাধারণ ডায়েরী করায় পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে ওইদিন রাতেই কনের বাড়িতে হাজির হন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জেনেছেন, কনে আকলিমা স্থানীয় সরকারী কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। দুই বছর আগে আকলিমা কলেজের পাশে ভুঁইয়া বাড়ির বেকার যুবক আদনানের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। আকলিমার বড় ভাই দাউদ পুলিশকে জানায়, আকলিমার সাথে যে ছেলেটির  প্রেমের সম্পর্ক ছিলো সে ছেলে গত এক বছর পূর্বে অন্যত্র বিয়ে করেছে। সে তার বউ নিয়ে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে থাকে জানি। এরপর আমার বোন অন্য কারো সাথে নতুনভাবে  সম্পর্কে জড়িয়েছে কি-না সেটা আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে নি। কী কারণে আকলিমা বিয়ের  অনুষ্ঠান শেষে পালিয়েছে আমরা তা জানি না। হাবিবের সাথে সপ্তাহ খানেক আগে বিয়ের সিদ্ধান্ত ফাইনাল করা হয়েছে। আকলিমা সেটা সেইদিনই জেনেছে। সিদ্ধান্তের পর ওদের ও আমাদের মাঝে মিষ্টি, পান-সুপারী ও গায়ে হলুদ, শাড়ি ও অন্যান্য সামগ্রী বিনিময় হয়েছে। তখনো আকলিমার মাঝে হাসি-খুশি ভাব দেখেছি। বিয়ে পড়ানো শেষে দর্শন পর্ব শেষ করার পর থেকে তার চেহারায় বিষন্ন ভাব দেখা গেছে। সেটা আমি দেখি নি, আমার মামাতো ভাইয়ের বৌ জিন্নাত ভাবী দেখে আমাকে বলেছে। একবারের জন্যও তার মুখে কোন হাসি দেখা যায় নি। সবকিছুতেই তার কেমন যেন গাছাড়া ভাব ছিল। চোখের জলে মেকআপ উঠে গেছে। আমি ভাবীকে ঝাঝি মেরে বলেছি, বিয়ের দিন মেয়েদের চেয়ারা বিষন্ন থাকাই স্বাভাবিক, আপনার বিয়েতে মনে হয় বর পাচ্ছেন ভেবে আপনি সারাদিন খুশিতে হেসেছেন ? দর্শনের প্রায় পৌনে এক ঘন্টা পর জেনেছি আকলিমাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের যেসব আত্মীয় স্বজনের কাছে যেতে পারে সেসব স্থানে আমরা খুঁজেছি। যে ছেলেটির সাথে তার ভাব ছিল সে তো বিয়ে করেছে, সে এখন চৌমুহনীতে থাকে। তবুও তার এখানকার বাড়িতেও খোঁজ নিতে লোক পাঠিয়েছি, লোকটি হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে খোঁজ নিয়ে ফিরে আসবে। তার মোবাইলটিও বন্ধ। আকলিমার পলায়নে আমাদের দুটি পরিবারের মাঝে যে আনন্দঘন পরিবেশ বইছিলো তা মুহূর্তে সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে গেছে। পুলিশ তার ডায়েরীতে ঘটনার সব বিবরণ লিপিবদ্ধ করে নেয় এবং উভয় পক্ষকে সান্তনা দিয়ে বর পক্ষকে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে উত্তেজিত পরিস্থিতি শান্ত করে থানায় ফিরে যায়।

.

পরদিন পুলিশ সম্ভাব্য স্বজন ও বান্ধবীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেয়, এছাড়া তমরুদ্দি লঞ্চঘাট ও নলচিরা সী-ট্রাক ঘাটে পাহারা বসানো হয়। ঘাটে ও গাড়িতে মুখ আড়াল করা মহিলা যাত্রীদের গত পাঁচ দিন ধরে তল্লাশি করেও আকলিমার কোন খোঁজ পায় নি পুলিশ ও তার পরিবার। আকলিমার স্বজনরাও তার বান্ধবীদের বাড়িসহ বিভিন্ন বাড়ি খোঁজ করে কোন সন্ধান পায়নি। এক সপ্তাহ গড়িয়ে গেল। বর পক্ষ আকলিমার বাবা, মা ও ভাই দাউদকে আসামি করে মানহানি ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে আদালতে মামলা ঠুকে দেয়। আদালত ওদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়।

.

নতুন বিয়ে করা বউকে ঘরে তুলতে না পারার লজ্জায় ও অপমানে গত কয়দিন থেকে ঘর থেকে বের হয় নি ইঞ্জিনিয়ার হাবিব। প্রতিক্ষণে তাকে সান্তনা দিয়ে তার মন ভাল করার চেষ্টা করছেন তার বন্ধু রঞ্জিত, মানিক ও অন্য বন্ধুরা। দর্শনের পর মেয়েটি পালিয়েছে কেন ? বিয়ের কাজ সমাপ্তির আগেই যে কোন সময় পালিয়ে যেতে পারতো। আক্দ হল, গায়ে হলুদ হল, এরপর বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজনও শেষ হল। তখনও মেয়েটি পালায় নি। দর্শনের পর পালালো কেন ? এর কারন খুঁজতে আজ হাবিবের চার বন্ধু একত্রিত হল হাবিবের বাড়িতে।

.

হাবিব : তোরা এটা নিয়ে অযথা চিন্তা করে তোদের মস্তিষ্কের হার্ডডিস্কের ওপর চাপ না বাড়ানোই ভাল হবে। আমি জানি মেয়েটি কেন পালিয়েছে।

.

রঞ্জিত : কেন পালিয়েছে বল দেখি ?

.

হাবিব : আমার কাছে দু’টো কারন মনে হচ্ছে, এ দুটোর যে কোন একটি কারনে মেয়েটি পালিয়েছে। প্রথমটি হলো মেয়েটি কাউকে হয়তো ভীষণ ভালবাসে। ভালবাসাকে চাপা দিয়ে এ বিয়ের আয়োজন সে মেনে নিতে পারে নি। এ ধরণের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে অনেক মেয়ের ক্ষেত্রে হয়েছে বলে শুনেছি।

.

রঞ্জিত : ভালবাসার কথাটি তো সে তার মাকে অথবা বাবাকে জানাতে পারতো। তাহলে তার বাবা-মা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবতে পারতো।

.

ফরিদ : নিশ্চয়ই জানিয়েছে। বাবা-মা ইঞ্জিনিয়ার পাত্র পেয়ে একেবারে বেহুশ হয়ে গেছে !

.

মানিক : তবে বিয়ের আগে তোর খোঁজ খবর নেওয়া উচিৎ ছিল । মেয়েটির সাথে সরাসরি কথা বলতে পারতি । তা না করে হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিস ? সব বিষয় অভিভাবকের ওপর ছেড়ে দেওয়া ঠিক হয় নি।

.

ফরিদ : এখন আর এসব উপদেশ দিয়ে কোন  লাভ নেই। দ্বিতীয় কারনটা বল।

.

হাবিব : দ্বিতীয় কারনটি হলো আমি যমকালো। হই না আমি ইঞ্জিনিয়ার, অনেক মেয়ে আছে স্বামীর যোগ্যতাকে মূল্যায়ন না করে চেহারাটাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাই হয়তো এ মেয়েটি আমার গায়ের রং দেখেও পালিয়ে যেতে পারে।

.

রঞ্জিত : না দোস্ত এটা আমি মানতে পারি না। কোন মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার পাত্র, এছাড়া বিদেশী কোম্পানীতে ভাল বেতনে জব করা প্রতিষ্ঠিত ছেলেকে অপছন্দ করার কোন কারন থাকতে পারে না। মেয়েটির নিশ্চয়ই কারো সাথে প্রেমের  বন্ধন ছিল।

.

হাবিব : কখনো কখনো কালোটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায় কোন কোন মেয়ের ক্ষেত্রে। ওই কোন কোন মেয়ের মধ্যে এ মেয়েটিও হয়তো একটি। প্রেমে মজে থাকলে সে আগেই পালাত, দর্শনের পর কেন ? পালিয়ে যেতে চাইলে সে আরো আগেই যেতে পারত। আমাকে দেখার পরই সে পালিয়েছে। এতে আমি শিউর কালো বলে আমাকে ওর পছন্দ হয় নি।

.

রঞ্জিত : এটা তোর উদ্ভট ভাবনা।

.

হাবিব : না রে না,  দোস্ত শুন তাহলে, আমার একটা বাস্তব ঘটনা বলি। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার আগে ধানমন্ডিতে এক ধনী পরিবারের বাসায় টিউশনি করতাম। যে ছেলেটিকে পড়িয়েছি সে থার্ড ইয়ারে চমৎকার রেজাল্ট করেছে। এতে ওই এলাকায় আমার সুনাম ও পরিচিতি বেড়ে যায়। এতে আরো তিনটি বাসায় আমার ডাক পড়ে। এ সময় আমার রেজাল্টও বের হয়। আমি চাকরীর জন্য ছুটাছুটি করছি,  পাশাপাশি সাধারণ নলেজের ওপর বিভিন্ন বই ও গাইড পড়া নিয়ে ব্যস্ত। হাতে সময় নেই তাই আমি ওদের বার বার নিষেধ করে দিই এবং বলে দিয়েছি, টিউশন করার মত সময় আমার হাতে নেই। ওদের মধ্যে আমার মায়ের বয়সী এক মহিলা তার বুয়েট পড়ুয়া মেয়েকে পড়ানোর জন্য আমার পিছে লেগে যায়। আমি রাজি হচ্ছি না দেখে খালা যেন আমার পায়ে পড়বে। আমি যা দাবি করবো উনি তার চেয়ে বেশি টিউশন ফি দিতে রাজি। অনেক অনুরোধের পর আমিও রাজি হলাম। দশ হাজার টাকার টিউশন ফি আমি পনের হাজার টাকা দাবি করলাম। ভেবেছি খালা হয়তো ফিরে যাবে, আমিও বেঁচে যাব। কিন্তু না, ফিরে যায় নি। বরং উনি আমি যা চেয়েছি তার চেয়ে আরো পাঁচ হাজার টাকা বাড়িয়ে বিশ হাজার টাকা মাসিক টিউশন ফি দেওয়ার অপার দিলেন। আমি ভাবলাম দুই চার জায়গায় ইন্টিরভিউ দিচ্ছি, কোথাও চাকরী হয়ে যাবে। তার আগ পর্যন্ত শুধু না হয় এই টিউশনটাই করি।

.

ফরিদ : কনে পালানোর সাথে টিউশনির বিষয় আসছে কেন ?

.

হাবিব : শেষ না করতে কথার মধ্যে বাম হাত ঢুকিয়ে দেওয়ার অভ্যাস তোর এখনো যায় নি ? কনে পালানোর সাথে টিউশনির সম্পর্ক আছে বলেই তো বলছি।

.

রঞ্জিত : চুপ করিস তো ফরিদ, হাবিবকে বলতে দে।

.

হাবিব : মেয়েটি বুয়েটের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। গায়ের রং উজ্জল শ্যামলা, খুবই স্মার্ট। মাত্র চার দিন পড়িয়েছি, মেয়েটি আমার বুঝানোর ধরণে খুবই মুগ্ধ। শুধু মেয়েটিই নয়, তার বাবা-মাও মুগ্ধ। তাই উনারা দু’জনেই মেয়ের সামনে তৃতীয় দিন আমার প্রশংসা করে বলেছেন, অনেক দিন পর একজন ভাল শিক্ষক পেয়েছি। পঞ্চম দিনের দিন মেয়েটির মা আমার হাতে একটি খাম আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, মাস্টার সাহেব কাল থেকে আপনি আর আসবেন না। ইশা আপনার কাছে পড়তে চাচ্ছে না। খালার মুখ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত কথা শুনে আমি তো ভয়ে ও লজ্জায় নাস্তানাবুদ।

.

মানিক :  নিশ্চয় তুই খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিস।

.

হাবিব : ইশাকে তো আমি এমন কোন আচরণ দেখাই নি যাতে সে আমার ওপর রাগ হতে পারে। এমন কী আমি লজ্জায় তার চোখের দিকেও ভাল করে কখনো তাকাতে পারি নি। বরং ইশাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত, আমি তা আড় চোখে দেখে লজ্জা পেতাম। তাকে আমি হয়তো রাস্তায় দেখলে চিনতে পারার মত অবস্থা এখনো হয় নি। লজ্জাবনত চিত্তে খালাম্মাকে আমি বললাম, খালা আমি এমন কিছু  করেছি যাতে ইশা আমার আচরণে কষ্ট পেয়েছে ? খালা আমাকে জানাল, আমিও তোমার কোন অপরাধ খুঁজে পাই নি, পেয়েছি তুমি ভাল বুঝাতে পার। তবুও তুমি আসবে না, প্লিজ। তুমি গত যে চার দিন পড়িয়েছ আমি তোমাকে পুরো মাসের টাকা দিয়ে দিলুম। আমি বললাম, খালা আমাকে অন্তত পনের দিন পড়ানোর  সময় দিন, এ সময়ের মধ্যে ইশার যদি কোন উন্নতি না আসে বা আমার প্রতি ওর আস্তা না আসে তাহলে আমি আপনাদের কাছে কোন সন্মানি দাবি করবো না, আসবোও না। খালা বার বার বলছেন, বাবা আমি তোমাকে না আসার কারণটা বলতে পারছি না, তুমি আর এসো না। আমি বললাম, ঠিক আছে খালা আমি না হয় আর আসবো না। তবে কারণটা না জানতে পারলে আমি সারাটা জীবন কষ্ট পাব, আমি নিজকে শুধরিয়ে নিতে পারব না। কোন কাজে আমার মন বসবে না, সারাটা জীবন আমি টেনশনে থাকব। খালা প্লিজ, আমি কেন আসবো না কারনটা আমাকে খুলে বলুন, কথা দিচ্ছি আমি মাইন্ড করবো না।

.

রফিক : পরে নিষেধের কারন কী বললেন ?

.

হাবিব : উনি লজ্জিত হয়ে বললেন, তোমার  আউট লুকিং ভাল নয়, যা আমার মেয়ে ইশা পছন্দ করছে না। শুধু প্রতিভা থাকলেই  হয় না, আউট লুকিংও ভাল হতে হয়। খালার মুখ থেকে এমন কথা শুনেই আমি থ হয়ে বসে রইলাম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি খামটি খালার সামনে সোফায় রেখে চলে এলাম। খালা খামটি আমাকে দেওয়ার জন্য আমার পিছনে পিছনে ডাকতে থাকে, আমি না শুনার ভান করে সোজা সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি এবং রিকশা নিয়ে হোস্টেলে ফিরে আসি।

.

রঞ্জিত : মেয়েটা হয়তো এ মুহূর্তে একজন হ্যান্ডসাম প্রেমিক খুঁজছে। তাই হয়তো তোকে তার পছন্দ হয় নি।

.

হাবিব : না, তা নয়। পৃথিবীতে কত বিচিত্র মানুষের জন্ম হয়, তাদের পছন্দ অপছন্দও বিচিত্র ধরনের। দোকানে কেবল মালামালে ঠাসা থাকলেই হয় না, সেই দোকানের ডেকোরেশনও সুন্দর হতে হয়। তা না হলে কোন কোন ক্রেতা যাবে না ওই দোকানে।

.

রফিক : বর্ণবাদ দ্বন্দ্ব এখানেও ! আমেরিকায় সাদা পুলিশ কয়দিন আগে কালো পথচারীকে গলায় পা চাপা দিয়ে মেরেছে। তা নিয়ে পুরো আমেরিকায় হুলুস্থুল কান্ড বয়ে যাচ্ছে।

.

হাবিব: আমেরিকার কথা রাখ। যে কোন সুন্দর  মেয়ে হয়তো  চাইবে ওর হাজবেন্ড যেন খুব সুদর্শন হয়। তার সাথে যেন তার স্বামীর সুন্দর একটা ম্যাচিং হয়। আমার সাথে বিয়ে হলে দেখা যাবে মেয়েটার লাইফটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে নিয়ে কোথাও বের হতে সে লজ্জা পাবে। সাথে নিয়ে কোথায়ও যেতে পারবে না, একটা সেলফি তুলে ফেসবুকে ছাড়তে পারবে না। বান্ধবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লজ্জা পাবে। একসাথে ঘুরতে বড়ই লজ্জা পাবে। তাছাড়া কালো ছেলেদের বিয়ে করলে পরিবার আত্মীয়-স্বজন অথবা সমাজের নিকট ছোট হতে হয়। বাহ্যিক লুকিং যদি ভাল না হয়, ইঞ্জিনিয়ার স্বামী ও তার  ধন-সম্পদ দিয়ে কী হবে ? এসব ভেবে হয়তো মেয়েটি সেদিন বিয়ের আসর থেকে পালিয়েছে। সব মেয়ে এক না, এ হয়তো সুন্দরের পূজারী।

.

মানিক : এত কিছু জেনেও তুই কেন বিয়ের তারিখ চুড়ান্ত হওয়ার পর এই কয়দিন চুপ করে বসে ছিলি। তোর উচিৎ ছিল বিয়ের আগে মেয়েটির সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে কথা বলা।

.

হাবিব: আমি মাকে সব সময় বলতাম, মা আমার জন্য কালো পাত্রী দেখতে। মা আমাকে বলতো, কালো মেয়ে বিয়ে করলে তোদের সন্তানরা হবে নিগ্রো টাইপের। তাছাড়া তুই একজন ইঞ্জিনিয়ার। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার ছেলের কথা শুনলে কোন মেয়েরই আপত্তি থাকার কথা নয়। যে মেয়েটি পছন্দ করেছি সে ফর্সা নয়, শ্যামলা। এতে কোন সমস্যা হবে না। মা বলে কথা ! মায়ের সিদ্ধান্ত কখনও আমান্য করি নাই। তাই দেখার প্রয়োজনও বোধ করি নি।

.

মানিক : আচ্ছা দোস্ত বিয়ের সময় সবাই ফর্সা ছেলে বা মেয়ে চয়েজ করে কেন ! আমার মতে বিয়ের ক্ষেত্রে ফর্সা ছেলে-মেয়ে  খোজা এই ধ্যানধারনা থেকে সবাই’র ফিরে আসা উচিৎ । কারন ফর্সা ছেলে-মেয়েগুলো হলো চিনির মতো, আপনি এটাকে যেখানেই রাখবেন পিঁপড়ের দল সেখানে হুর হুর করে চলে আসবে। ফর্সা ছেলে-মেয়েরা এজন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিপদের আশংকায় থাকে। সুন্দরী মেয়েদের প্রতি ছেলেদের সব সময় আকর্ষণ থাকে, সুন্দর ছেলেরাও সব মেয়েদের কাছে আকর্ষনীয়- এটা আমি স্বীকার করি। কিন্তু এই আকর্ষণটাই এক সময় কারো কারো ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিয়ের পরও ফর্সা ছেলেদের প্রতি অন্য বিবাহিত-অবিবাহিত মেয়ে এবং ফর্সা মেয়েদের প্রতি অন্য বিবাহিত-অবিবাহিত ছেলে বিকারগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকায়। এক সময় হয়তো এসব ফর্সা সুন্দর-সুন্দরীদের চরিত্রে কালিমার দাগ পড়ে। পরকীয়ায় জড়ায়, কারো কারো সংসার ভেঙ্গে যায়।

.

হাবিব : ফর্সা হওয়াটা কোনো অপরাধ নয়, কালো হওয়াটাও নয়। তবে আমার মতে যারা শুধু গায়ের রং দেখে পাত্র-পাত্রি নির্বাচন করে, তাদের নিজেদের জীবনের রঙও এক সময় ফিকে হয়ে যায়। বাকি জীবনটা কাটতে থাকে এক কাল্পনিক একাকীত্বে।

.

রঞ্জিত: আসলে ভুলটা করেছেন আন্টি । এমন মেয়ে পছন্দ করার আগে ছেলে-মেয়ে দু’জনের মধ্যে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল। এখন তোরা যতটা ক্ষতিগ্রস্ত ও সমাজে অপমানিত হয়েছিস, কনে পক্ষ তোদের চেয়ে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও অপমানিত হয়েছে। যা হওয়ার হয়ে গেল, এটা নিয়ে আর না ভাবাই ভাল। তবে আমার অনুরোধ কনে পক্ষকে হয়রানি না করে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া ভাল হবে। মেয়ে পালিয়েছে, এ জন্য অভিভাবকদের কী দোষ ?

.

রফিক : কেন মামলা তুলে নিবে ? ইঞ্জিনিয়ার পাত্র দেখে ওদের হুশ ছিল না কেন ? মেয়ে কী করে, মেয়ের মনোভাব কী, তার পছন্দের কেউ আছে কি-না এসব না জেনে বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করেছে কেন ওরা ? ওদের শাস্তি হওয়া উচিৎ।

.

রঞ্জিত : খোঁজ খবর নেওয়ার দায়িত্ব ওদের চেয়ে আমাদের নেওয়াটা বেশি প্রয়োজন ছিল। আর্থিকভাবে ওরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তবে ওদের চেয়ে আমরাই বেশি অপমানিত হয়েছি। এ জন্য আমরাও দায়ী। তাছাড়া এখন মোবাইলের যুগ। অচেনা অজানা মেয়েকে অযথা কল দিয়ে বা ফেসবুকে চ্যাট করে আমরা ছেলেরা বিরক্ত করে থাকি। আর ওপাশ থেকে গালি শুনি, ব্লক খাই, তবুও মেয়েটির পিছু ছাড়ি না। আর এ তো সিলেক্ট করা বউ। বিয়ের দিনক্ষণ ফাইনাল হওয়া বর তার হবু বউকে একবারের জন্য কল দিয়ে বলতে পারে নি, তুমি কেমন আছ, তুমি কী কোথায়ও এঙ্গেইজ কি-না বা আমার মত  যমকালো ছেলে তোমার পছন্দ হবে তো ? চ্যাট করে বা ভিডিও কল দিয়েও কথা বলা যেত। ওপাশ থেকে গালি বা ব্লক জুটতো না, বরং হবু বৌ আরো খুশিই হত, পছন্দ না হলে মেয়ে তোমাকে না করে দিত। সেও আগে-ভাগে তার অভিভাবকদের নিষেধ করতে পারত, আমাদেরকেও বিয়ে বাড়িতে গিয়ে এভাবে অপমানিত হয়ে খালি হাতে ফিরতে হত না। কোনটাই করা হয় নি। যে ব্যক্তি নিজের বিচার নিজে করতে পারে না সে কখনো সন্মানিত হতে পারে না।

.

হাবিব : দোস্ত তোর কথা আমি মানলাম। যেদিন আমি শিউর হবো মেয়েটির কারো সাথে সম্পর্ক ছিল এবং  ওই ছেলের হাত ধরে পালিয়েছে তাহলে আমি মামলা প্রত্যাহার করবো না। আর যদি কেবল কালো কলঙ্কের দায় দিয়ে পালিয়েছে তাহলে আমি মামলা তুলে নেব।

.

রঞ্জিত : ঠিক আছে মানলাম। আর যদি এটা হয়, অন্য ছেলের সাথেও প্রেম চলমান, ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের কথা শুনে খুশিতে প্রেমে কিছুটা যবনিকা টেনেছে, দর্শন পর্বে তোমাকে দেখে অপছন্দ করে আগের প্রেমিককে খবর দিয়ে এনে ওর সাথে পালিয়েছে তাহলে কী করবে ?

.

হাবিব : শালা, তোর মধ্যে সব সময় নোয়াখাইল্যা প্যাচ। এটা হলেও আমি মামলা প্রত্যাহার করবো।

.

বন্ধুরা সবাই হাবিবের কথায় একমত হল। এ সময় দুপুরের খাবার টেবিলে সাজিয়ে মায়ের ডাক, এই হাবিব সবাইকে নিয়ে টেবিলে আয়, খাবার দেওয়া হয়েছে। তাড়াতাড়ি আয়, বিড়াল খুব উৎপাত করছে, খাবারে মুখ বসিয়ে দেবে। সবাই হাবিবের রুম থেকে বের হয়ে খাবার টেবিলে খেতে বসে।

.

মাস গড়িয়ে গেল, আকলিমার সন্ধান এখনো পাওয়া যায় নি। দ্বীপের সীমিত এলাকায় কেউ এভাবে মাসাধিক সময় লুকিয়ে থাকতে পারার কথা নয়। লঞ্চ ও সী-ট্রাক ঘাটেও প্রতিদিন নজরদারী অব্যাহত রাখা হয়েছে। হাবিবও এরপর ঢাকায় তার কর্মস্থলে ফিরে যায়। থানায় সাধারণ ডায়েরী থাকায় পুলিশও বসে নেই। বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যাওয়া আকলিমাকে উদ্ধারে হাতিয়া থানা পুলিশের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য থানাগুলোতে তার বিভিন্ন ধরনের ছবি পাঠানো হয়েছে। কোথায়ও সন্ধান পাওয়া যায় নি।

.

সময় আরো গড়িয়ে যায়। পরিবারের  লোকজন হতাশ হয়ে আকলিমাকে ফিরে পাওয়ার আশাও ছেড়ে দেয়। আত্মীয়-স্বজনরা ধীরে ধীরে আকলিমাকে ভুলে যেতে থাকলেও মা প্রতিদিনই বুকের ধন ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রায়শ: নির্ঘুম রাত কাটায়। সেই প্রাণপ্রিয় সন্তান, যাঁকে তিনি জন্ম দিয়েছেন, কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন, সেই সন্তান নিখোঁজের দুঃখবোধ তাঁকে তাড়া করে ফিরছে প্রতিনিয়ত। মা প্রতিদিন গভীর রাতে নফল নামাজ পড়ে জায়নামাজ ভাসিয়ে দেয় চোখের জলে। মুনাজাত করে খোদার কাছে ফরিয়াদ জানায়, হে খোদা, দশ মাস দশ দিন গর্ভে  ধারণ করেছি, জন্মের পর থেকে আমার বুকের উপর কয়েক মণ প্রস্রাব পায়খানা করেছে, কখনো বিরক্ত হইনি। বুকে পিঠে নিয়ে বড় করেছি। লেখা-পড়া শিখিয়েছে। বড় হয়ে সেই জন্মদাতা মাকে অস্বীকার করে বাবা-মায়ের মুখে চুন কালি লেপটে দিয়ে আমার সেই আঁতছেড়া ধন অজানার উদ্দেশ্য পালিয়েছে। তবুও তার প্রতি আমার রাগ ক্ষোভ ও অভিশাপ নেই। আমি তো তার জন্মদাত্রী মা।  যেভাবে হঠাৎ করে চলে গেছে, হয়তো সেভাবেই একদিন হঠাৎ করে ফিরে আসবে সেই আশায় আমি এখনো অপেক্ষার প্রহর গুনছি। কতো মানত, কতো পীর-ফকিরের পানি পড়া আর তাবিজ ধারণ করেছিলাম- তার হিসেব নেই। আমার মেয়ে যদি কোন ছেলের হাত ধরে চলেও যায়, তুমি ওই ছেলেটিসহ আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।  আমি ওদের বিয়ে মেনে নেব, তবুও তুমি আমার বুক খালী কর না। আমার বুকের ধনের স্মৃতিবিজড়িত ঘরের প্রতিটি কোণায় কোণায় আমি কেবল খুঁজে বেড়াচ্ছি।  আমার আদরের সন্তানকে তুমি কোথায় রেখেছ, কীভাবে রেখেছ ?  আমি জানি না আমার ধন সুখে আছে কি-না, তিন বেলা খেতে পারছে কি-না, এসব চিন্তায় আমিও না খেয়ে থাকার মত। প্রতিটি ভাতের লোকমা মুখে নেওয়ার সময় ভাবি, আমার মেয়েটি এভাবে প্রতি বেলা খেতে পারছে তো ? খাওয়ার সময় কোন ফকির এলে আমার খাবারগুলো না খেয়ে ফকিরকে দিয়ে দিই যেন ফকিরের দোয়ায় মেয়েটা যেন তিন বেলা খেতে পারে। হে খোদা, হয় আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও, না হয় তুমি আমাকেও তুলে নিয়ে যাও। আমি আর সইতে পারছি না। সন্তানের সন্ধান পাওয়ার আশায় আমি এখনো বুক বেঁধে আছি। তুমি আমার বুকের ধন ফিরিয়ে দাও। -আমিন ।

 .

এরই মাঝে প্রায় দু’টি বছর কেটে গেল। একদিন বিকালে কোলে এক বছরের একটি যমকালো কন্যা শিশু নিয়ে আকলিমা নীল কাগজে স্বামীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ নিয়ে হাজির হয় চট্টগ্রাম সদর ঘাট থানায়। স্বামীর বিরুদ্ধে তার অভিযোগ ছিল, বিয়ের পর থেকে আমার স্বামী আদনান নিয়ে চট্টগ্রাম সদর ঘাট এলাকায় মাঝির ঘাটে একটি বাসা ভাড়া করে বসবাস করতে থাকি। আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনে সাউথ আফ্রিকা যাওয়ার ফন্দি আঁটি। এ সুবাদে স্বামী আদনান একদিন আফ্রিকান এক যুবককে বাসায় নিয়ে আসে এবং আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে, দু’জন আফ্রিকা যেতে প্রায় দশ লক্ষ টাকা লাগবে। এত টাকা আমরা পাব কোথায় ? তাছাড়া ঐ দেশের একজন জিম্মাদার ব্যক্তি লাগবে। উনিই আমাদের জিম্মাদার হবেন এবং আমাদের অর্ধেক খরচ উনিই বহন করবেন এবং ভিসা ও অন্যান্য ডুকুমেন্টস উনিই সংগ্রহ করবেন। আজ থেকে উনি আমাদের সামনের রুমটায় থাকবেন। আশা করি উনার কল্যাণে আমরা ছয় মাসের মধ্যে আফ্রিকায় চলে যেতে পারবো বলে স্বপ্ন দেখায়। আমি আদনানকে সরল বিশ্বাস করে আফ্রিকান যুবক সাদমানকে বাসায় থাকতে দিই। কিছু দিন পর আমার স্বামী ব্যবসায়িক কাজে ফরিদ পুর যাওয়ার কথা বলে আর ফিরে আসে নি। কয়েক দিন পর আজ্ঞাত এক নম্বর থেকে ফরিদপুর সদর থানার ওসি পরিচয় দিয়ে আমাকে মোবাইলে জানান, আপনার স্বামী আদনান সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমরা লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে গণকবরে দাপন করেছি। কী আর করা, আমি বুঝে গেলাম আফ্রিকা যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাওতাবাজি। আদনান আমাকে আফ্রিকান যুবক সাদমানের কাছে বিক্রি করে দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। আমাদের বিয়ের পর একদিন জানতে পেরেছি  সে আগে একটি বিয়ে করে আমার কাছে গোপন রেখে হাতিয়ার সাদ্দাম বাজারের পাশে বাড়ি করে ওখানে থাকে। কয়দিন আমার কাছে আবার কয়দিন ওই বৌয়ের কাছে থাকে। এ নিয়ে তার সাথে আমার প্রায়শ: ঝগড়া হতো। ওই বউকে নিয়ে সে সাদ্দাম বাজার কোন এলাকায় থাকতো তা আমি এখনো জানতে পারি নি।  আফ্রিকান যুবক সাদমানকে আমার ঘাড়ের ওপর তুলে দিয়ে সে গা ঢাকা দেয়। সাদমান আমাকে তার বৌ এর মত ছয় মাস ব্যবহার করে সেও পালিয়ে যায়। সাদমানের রেখে যাওয়া দুই লক্ষ টাকা দিয়ে আমি এতদিন আমার বাসা ভাড়াসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করেছি। এখন আমার কাছে থাকা টাকা  ফুরিয়ে যাওয়ায় এবং আদনান ও সাদমানের প্রতারণার শিকার হওয়ায় এখন আমার ভবিষ্যত অন্ধকার । তাছাড়া আমি আমার কোলের কালো মেয়েটি নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব ? তাই আমি আমার প্রতারক স্বামীর প্রতারণার বিচার প্রার্থনা করছি। ইতি….আকলিমা

.

ওসি প্রদীপ বাবু আরজি পড়ে শেষে জানতে চাইলেন, আপনার বাড়ি কোন এলাকায় ?

.

-আমার বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায়। হাতিয়া পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডে। আমার বাবার নাম জয়নাল মিয়া।

.

-বিয়ে হয়েছে কবে ?

.

-প্রায় দুই বছর আগে।

.

-বাবা-মা দিয়েছেন ? নাকি নিজের সিদ্ধান্তে করেছেন ?

.

-নিজের সিদ্ধান্তে।

.

-ভুলটা তো এখানেই। বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ আছে ?

.

-না স্যার, দুই বছর থেকে যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ করার মত সে অধিকার আমি হারিয়ে ফেলেছি।

.

-কেন হারিয়েছেন ?

.

-যোগাযোগ থাকার কোন পথ নেই। আমি বিয়ের আসর থেকে আমার প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে এসেছি।

.

-বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছেন মানে ? ঘটনাটি খুলে বলুন।

.

-বাবা আমার মতামত না নিয়ে আমাদের এলাকার এক ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের সাথে বিয়ে ঠিক করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের কথা শুনে আমি অনিচ্ছা থাকা সত্তেও কিছুটা নিমরাজি ছিলাম। বিয়ে হল, দশ লাখ এক টাকার কাবিনও করা শেষ হল। দর্শনের সময় বরের মুখ দেখে আমার খুবই ঘেন্না হল।

.

-কেন ?

.

-বর ছিল যমকালো। ওকে দেখেই আমার কেমন যেন ঘেন্না হলো। কোন মতে দর্শন পর্ব শেষ করে আমি আমার পুরনো প্রেমিক আদনানকে কল দিই ও আমার পরিকল্পনার কথা জানাই। ও কিছুক্ষণের মধ্যে তার এক বন্ধুকে নিয়ে একটি হোন্ডাসহ আমাদের বাড়ির পিছনের রাস্তায় অপেক্ষা করে। আমি দ্রুত পালিয়ে এসে হোন্ডায় উঠি। আদনানের এক বন্ধু আমাদেরকে একটি স্পীড বোট ভাড়া করে দেয়, আমরা রাতে চেয়ারম্যান ঘাটে পৌঁছি। ওই রাতেই একটি মাইক্রো নিয়ে সকালে চট্টগ্রাম পৌঁছে ওর এক বন্ধুর বাসায় উঠি। আসার পথে আদনান ও আমি আমাদের ব্যবহৃত মোবাইল ও সীম পথে ফেলে দিই। সেখানে তিন দিন থাকার পর সহনীয় ভাড়ায় মাঝির ঘাটে দুই রুমের একটি বাসা ভাড়া করি ও দুইজনেই নতুন সীম ও মোবাইল কিনি।

.

-ফর্সা গায়ের রং মানেই সেই ছেলেটি সুন্দর নয়, ফর্সা গায়ের রং ছেলেদের সৌন্দর্যের একটা উপাদান মাত্র। তার ফর্সা বিচার হবে তার যোগ্যতা, আচরণ ও কর্মের পরিমাপ দ্বারা। আপনি সেটা বিবেচনায় না নিয়ে কেবল বর কালো বলে  পালিয়েছেন ? মা-বাবার মুখে চুনকালি মাখতে আপনার একবারও বুঝি বুক কাঁপল না।

.

-টিভি নাটকে বিভিন্ন সময়ে চোর বা ভিলেনের অভিনয় করে কী যেন নাম, বর একদম ওর মত।

.

-কাজল (ছদ্দ নাম)।

.

-জি স্যার, কাজলের মতই গায়ের রং।

.

– ইঞ্জিনিয়ার বরকে কাজলেরর মত দেখে আপনি পালিয়েছিলেন। আপনি সেই কাজল থেকে নিজকে বাঁচাতে গিয়ে প্রতারকের হাত ধরে পালিয়ে আফ্রিকান কাজলের খপ্পড়ে পড়ে মান-সন্মান আত্মীয়-স্বজন সব হারিয়েছেন। আপনি এখন আরেকটি কাজলীকে কোলে নিয়ে এখন থানায় এসেছেন। এ কাজলীকে নিয়েই হয়তো আপনাকে আজীবন বেঁচে থাকতে হবে। কালো বলে কাউকে ঘৃণা করতে নেই। সেই কালোর মাঝেই হয়তো লুকায়িত ছিল আপনার আমৃত্যু সুখ ও শান্তি। আপনি এখন আপনার কোলের এই শিশুটিকে নিয়ে রাস্তায় বের হলে সবাই আপনার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে, নিগ্রো চেহারার এ শিশুটি আপনার কোলে কেন, কোথায় পেলেন এ শিশুটি -এমন হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। বিয়েতে কালো, খাটো, গরিব, পঙ্গু— এগুলো কোনো বিষয়ই না। ভুল সিদ্ধান্তে পা না বাড়িয়ে মা-বাবার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে যদি আপনি যমকালো ইঞ্জিনিয়ার পাত্রকে বিয়ে করে যে সন্তানটির জন্ম দিতেন সে সন্তানটি কালো হলেও তার চেহারায় বাঙ্গালীত্ব থাকত। কেউ আপনার দিকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকাতো না। যা করেছেন ভুলই করেছেন। আপনার এখন পিছনে ফিরে যাওয়ার আর কোন পথ নেই। ওদের মোবাইল নম্বর জানা থাকলে বলুন।

.

-আগের সীম ওরা কেউ এখন ব্যবহার করছে না। ওরা গা ঢাকা দিয়ে নম্বর পরিবর্তন করে ফেলেছে । নতুন নম্বর আমার জানা নেই।

.

-আফ্রিকান যুবকটি কী করতেন, আপনার জানা আছে ?

.

-তা আমি জানি না, সারাদিন বাহিরে কোথায়ও যেত। মাঝে মধ্যে দুই তিন দিন বাসায় ফিরতো না। থেমে থেমে আমার সাথে বাংলায় কথা বলতো। তবে বিভিন্ন সময় ওর মোবাইলে ফোন আসত। লটারীর টাকা নিয়ে ইংলিশে আলোচনা করতো। বুঝতে পারতাম কে যেন লটারী পেয়েছে, টাকা নিতে হলে তার দেওয়া নম্বরে বিকাশ করতে বলতো।

.

-আর কিছু জানেন ?

.

-সে বাথরুমে ঢুকলে মোবাইল সাথে নিয়ে যেত। একদিন সে ভুলে বিছানায় মোবাইল রেখে বাথ রুমে ঢুকলে আমি তার মোবাইল চেক করে দেখে বুঝতে পারলাম সে নিজেকে নাইজেরিয়ান বা সিনেগালের মহিলা নাগরিক পরিচয় দিয়ে ফেসবুকে বেশ কয়েকটি বিপরীত লিঙ্গের আইডির সাথে চ্যাট করে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে । তার বাবা মারা যাওয়ার সময় তার একাউন্টে কয়েক হাজার বিলিয়ন টাকা রেখে গেছেন। ওই টাকা এখন তার চ্যাট করা বাংলাদেশি বন্ধুর  একাউন্টে স্থানান্তর করবে এবং বাংলাদেশে এসে ওই ছেলেকে বিয়ে করবে এসব চ্যাট করতো। আমি সবটুকু পড়তে পারি নি।

.

-ও বুঝেছি, সে আন্তর্জাতিক প্রতারক। আপনি তার এসব কর্মকান্ড এতদিন পুলিশকে জানান নি কেন ?

.

-কীভাবে জানাবো স্যার ? সে যখন বাথরুম থেকে বের হয়ে বুঝতে পেরেছে আমি তার মোবাইলের চ্যাটগুলো পড়েছি তার পরদিনই সে আমাকে ছেড়ে চলে যায়।

.

-আপনাকে ছেড়ে গেছে কয়দিন হতে পারে ?

.

-আমার বাচ্ছাটির জন্মের পাঁচ মাস আগে। এখন থেকে প্রায় দেড় বছর আগে হতে পারে।

.

-ঠিক আছে আপনার অভিযোগটি আমি রাখলাম। আপনার মোবাইল নম্বরটি তো অভিযোগের মধ্যে দেওয়া আছে। প্রয়োজন হলে আমরা এই নম্বরে কল দিয়ে আপনাকে পাব তো ?

.

-অবশ্যই পাবেন।

.

-আমরা তদন্ত শেষে নতিভূক্ত করে প্রতারকদ্বয়কে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবো। আপনি এখন যেতে পারেন।

.

-স্যার, উনাকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বললেন সদরঘাট থানার সেকেন্ড অফিসার।

.

-কেন ছাড়া যাবে না ?

.

-উনার অভিযোগ শুনে আমি এইমাত্র হাতিয়া থানায় উনার বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে জেনেছি, ওখানে দুই বছর আগে বিয়ের আসর থেকে উনি নিখোঁজ হয়েছেন এ সংক্রান্ত একটি জিডি নতিভূক্ত করা হয়েছিল। জিডিটি পরে নিয়মিত মামলা হিসেবে এখনো চলমান আছে। এ মামলায় কয়েকজন আসামী গ্রেফতার হয়ে এখন জামিনে আছেন। এছাড়া হাতিয়া জুডিশিয়াল আদালতে বর পক্ষের করা অপর একটি মামলায় উনার মা-বাবা ও বড় ভাই তিন মাস হাজতবাস থেকে এখন জামিনে আছেন। ওই মামলাটিও চলমান। কাল হাতিয়া থানা থেকে লোক আসছেন। উনাকে সেখানকার আদালতে হাজির করা হবে।

.

-সরি ম্যাডাম, আপনাকে ছাড়া যাবে না। আপনি ওর সাথে ভিতরে যান, কাল হাতিয়া থানা থেকে লোক আসবে। ওরা আপনাকে ওখানে নিয়ে আদালতে পৌঁছে দেবে।

-সমাপ্ত

 

 

 

 

 

 

 


বুয়েট উদ্ভাবিত অক্সিজেট মেশিন ব্যবহারের অনুমোদন

নোয়াখালীতে আরও ২২৮জনের করোনা শনাক্ত, মৃত্যু ১

বেগমগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার,স্বামী আটক

হাতিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় জাহাজের লষ্কর নিহত, বাবুর্চি আহত

দেশে করোনায় ২৩৭ মৃত্যু, মোট মৃত্যু ২০ হাজার ছাড়াল

নিঝুম দ্বীপে বরের বয়স ৭১, কনের আত্মহত্যা

ভাসানচরে সাগর কুলে যুবকের মরদেহ, ৪ রোহিঙ্গা যুবক আটক

সাগরে ভাসতে থাকা ট্রলার থেকে ১১ জেলে উদ্ধার

একনেকে ২ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন

হাতিয়ায় কাউন্সিলরের মারধরের ২দিন পর ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ

নোয়াখালীতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থ ও মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্যের মোড়ক উন্মোচন

চাটখিলে নবম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গৃহ শিক্ষক আটক

নোয়াখালীতে ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ৩০.৩৮ শতাংশ, মৃত্যু ১

টিকা প্রদানে উৎসাহিত করতে কাজ করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

করোনায় রেকর্ড ২৫৮ জনের মৃত্যু

এই সম্পর্কিত আরো