দেহে বহু ব্যাধির ‘আহ্বায়ক’ ডায়াবেটিস

শনিবার, মার্চ ১১, ২০১৭

201906_140

স্বাস্থ্য ডেস্ক : রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হলে ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেয়। সাধারণত ডায়াবেটিস বংশগত কারণে ও পরিবেশের প্রভাবে হয়। কখনো কখনো অন্যান্য রোগের ফলেও হয়ে থাকে। এ রোগ সবারই হতে পারে। ডায়াবেটিস একবার হলে আর সারে না। এটা সব সময়ের এবং সারাজীবনের রোগ। তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। অতিরিক্ত প্রস্রাব, অত্যধিক পিপাসা, বেশি ক্ষুধা, দুর্বল বোধ করা এবং কেটে ছিঁড়ে গেলে ক্ষত তাড়াতাড়ি না শুকানো ইত্যাদি এ রোগের সাধারণ লক্ষণ। যাদের বংশে রক্তসম্পর্কযুক্ত আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস আছে, ওজন খুব বেশি, বয়স ৪০-এর ওপর এবং যারা শরীরচর্চা করেন না, প্রায় সময়ে গাড়ি চড়েন এবং বসে বসে অফিসের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অত্যধিক চিন্তাভাবনা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, আঘাত, সংক্রামক রোগ, অস্ত্রোপচার, অসম খাবার, গর্ভাবস্থা এবং ওজন বেশি বৃদ্ধি পাওয়া এ রোগ বাড়াতে সাহায্য করে। এগুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রথম থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষামতে- নগরায়ণ, ‘ওয়েস্টার্ন ফুড’ আর সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ডায়াবেটিস বিস্তারকে করছে বেগবান। বিশ্ব রোগ নিরাময় কেন্দ্রের মতে, এই শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছার আগেই এটি মারাত্মক মহামারী রূপে আবির্ভূত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডায়াবেটিক তথ্য নিকাশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, যুক্তরাষ্ট্রেই এই ঘাতকব্যাধি বছরে ১৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি করে সে দেশের জাতীয় অর্থনীতির।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০০০ সালে ভিত্তি বছরে বিশ্বে ডায়বেটিক রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি (বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ)। তাদের আশঙ্কা ২০৩০ সালে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। প্রাদুর্ভাব ও বিস্তারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নত বিশ্বে টাইপ-২ অর্থাৎ ইনসুলিন নিরপেক্ষ রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি (১৮০ শতাংশ), এর পর আফ্রিকা মহাদেশে (১৬০ শতাংশ), তারপর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় (১৫৫ শতাংশ) ডায়াবেটিক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বে এই রোগের গড় বিস্তার যেখানে ১১৪ শতাংশ, আমাদের বাংলাদেশে সেই বিস্তারের হার ১৪৯ শতাংশ যা বেশ আশঙ্কাজনক।
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রায় সব ক’টি দেশই এক থেকে পাঁচ দশক ধরে স্বাধীনতা ভোগ করে এলেও দেশগুলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মূল (স্থূল) জাতীয় উৎপাদনের (Gross National Product) স্বল্পতা, অক্ষরজ্ঞানের নিম্নহার, অনুন্নত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, অপর্যাপ্ত জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা, ব্যাপক অপুষ্টি, উচ্চজন্ম ও শিশু মৃত্যুর হার এবং পৌনঃপুনিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করে চলছে। এত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি দমনের সাথে সাথে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের আয়ুষ্কাল ধীরে ধীরে হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে, বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যথা- ডায়াবেটিস মেলাইটাস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির প্রকোপ বেড়েছে।
ডায়াবেটিক মেলাইটাস সংক্রামক রোগ না হওয়ার কারণে এখনো পর্যন্ত, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশের স্বাস্থ্য কার্যক্রমের অগ্রাধিকার তালিকায় সংক্রামক রোগের তুলনায় এর স্থান অনেক নিচে। ডায়াবেটিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কর্মসূচি এসব দেশে সন্তোষজনকভাবে গড়ে ওঠেনি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয় ঠিকই কিন্তু রোগীকে ইনসুলিন দেয়া হয় কেবল হাসপাতালে ভর্তি হলেই; বহির্বিভাগের রোগীকে কখনই ইনসুলিন দেয়া হয় না। দেশের ৮৫ শতাংশ অধিবাসী পল্লী অঞ্চলে বাস করে। সেখানে ইনসুলিন পাওয়া যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডায়াবেটিসের মতো আজীবন রোগের প্রতি যে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন, এই সব উন্নয়নশীল দেশে সে সস্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা নেই। যেসব হাসপাতালে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করা হয়। সেখানেও এসব রোগীর কোনো নথি কিংবা তালিকা রক্ষা করা হয় না; এমনকি কোনো কেন্দ্রীয় নিবন্ধনও নেই।
দেহে ‘বহু ব্যাধির আহ্বায়ক’, নীরব ঘাতক স্বভাবের ডায়াবেটিস রোগটির অব্যাহত অভিযাত্রায় শঙ্কিত সবাইকে এটি নিয়ন্ত্রণে যথাসচেতন করে তুলতেই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ২৮ ফেব্রুয়ারিকে ডায়াবেটিক সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ১৯৫৬ সালের এ দিন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে সংক্রামক ব্যাধি নিচয়ের নিয়ন্ত্রণে গোটা বিশ্বে সবাই উঠে পড়ে লাগলেও এবং গুটি বসন্ত ও পোলিও নির্মূলে সফল হলেও মানুষের সুন্দর সাবলীল জীবনযাপনের পথে নীরবে তার সর্ব কর্মক্ষমতা হরণকারী অ-সংক্রামক ব্যাধি ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি সচেতনতার অনিবার্যতা এবং এর জন্য সুপরিকল্পিত সার্বজনীন উদ্যোগ গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকতা মনোযোগের চৌহদ্দিতে আসছে না বলে প্রতীয়মান হয়। ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রতি বিশ্ব দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সব সরকার ও জনগণের তরফে সংহত ও সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসঙ্ঘকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধকল্পে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। মূলত ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রচারণা-প্রয়াসে ১৪ নভেম্বরকে প্রতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসঙ্ঘ ২০০৬ সালে ৬১/২২৫ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। সেই থেকে সব সদস্য দেশে, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের ২ শ’র অধিক সদস্য সংগঠনে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থা, কোম্পানিও পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে এই দিবস প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে।
ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৪-২০১৮) মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘ডায়াবেটিস রোগকে জানা, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধের মাধ্যমে এর বিস্তার রোধ’। এটি (ক) ডায়াবেটিক রোগীদের শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন (খ) সরকারগুলোকে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে ও প্রতিরোধমূলক উপযুক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবেলা (গ) স্বাস্থ্যকর্মী পেশাজীবী সম্প্রদায়কে অধিকতর গবেষণা ও বাস্তব কৌশল উদ্ভাবনের দ্বারা উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগে যত্নশীল হওয়া এবং ( ঘ) সাধারণ জনগণকে ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে কিভাবে এর থেকে দূরে থাকা বা প্রতিরোধ করা সম্ভব সে সম্পর্কে সচেতন হওয়ার তাগিদ দেয়া। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে ব্যক্তির সজ্ঞান ও আন্তরিক আগ্রহ আবশ্যক। তাকে উদ্বুদ্ধকরণ, সার্বিক সহায়তা প্রদান, চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি এবং উপায়-উপকরণ সরবরাহ তথা পরিবেশ নির্মাণে অবিসংবাদিত ভূমিকা রয়েছে সরকার ও সমাজের। সুস্থ জনশক্তি বা নাগরিকের সুস্বাস্থ্য সব সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবসের প্রচারণায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডায়াবেটিস থেকে রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। যাদের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে আর এ চিকিৎসায় নিবেদিত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী- সবারই শিক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের বিস্তার থামানো, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদারকরণ এবং এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া সীমিতকরণ। এসব প্রচারণা মূল 3E (Education, Engagement and Empower) বা তিনটি প্রতিপাদ্যে প্রতিষ্ঠিত; অর্থাৎ সবাইকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন করতে শিক্ষার প্রসার, অধিকসংখ্যক রোগী-অরোগী-চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও সেবায় সম্পৃক্তকরণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে ক্ষমতায়ন।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান।
চিফ কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে ২৫ রোহিঙ্গা আটক

নোয়াখালীতে আ’লীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা

হাতিয়ায় ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক

হাতিয়ায় আধুনিক মৎস্য শিকার প্রযুক্তি বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

হাতিয়ায় শপথ নিলেন ৮৪ ইউপি সদস্য

প্রাথমিকে উন্নীত স্কেলে বেতন নিশ্চিত করতে ডিপিই’র নির্দেশনা

দারিদ্র্য বিমোচনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর কাজ করা উচিত: প্রধানমন্ত্রী

নোয়াখালীতে পূজামণ্ডপে হামলা: যুবদল-জামায়াতের গ্রেফতার ১১

আবাসিকে এলাকায় নতুন গ্যাস সংযোগ কেন নয়: হাইকোর্টের রুল

আইসিইউ থেকে কেবিনে এখন খালেদা জিয়া

উঠছে নিষেধাজ্ঞা : মধ্যরাত থেকে ইলিশ আহরণ শুরু

হাতিয়ায় ভ্রাম্যমান আদালতে ৪ দোকানীকে জরিমানা

নোয়াখালীতে পরকিয়ার জেরে নববধূকে হত্যা, স্বামীর যাবজ্জীবন

হাতিয়ায় জেলেদের মাঝে চাল বিতরণ

রেজা-নূরের নতুন দলের আত্মপ্রকাশ মঙ্গলবার

এই সম্পর্কিত আরো