এম দিলদার উদ্দিনের ভালবাসার গল্প : গোধূলি লগ্নে প্রেম

সোমবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০২০


।। এম. দিলদার উদ্দিন ।।


.
সপ্তাহ খানেক হলো ফেসবুকে শিরিন নামের এক তরুনীর সাথে ম্যাসেঞ্জারে কথোপকথনের সুবাদে পরিচয় হয় রিপোর্টার দিনার খানের সাথে। সেই থেকে দু’জনের মাঝে প্রতিদিনই এক বা একাধিক বার চ্যাটিং হচ্ছে। দিনার খান সাংবাদিকতা ছাড়াও করোনাকালে লকডাউনে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি হয়ে পড়ায় ইদানিং গল্প লিখায় সারক্ষণ ব্যস্ত থাকে। তাই মাঝে মধ্যে শিরিন চ্যাটিং-এ এসে হাই হ্যালো করলেও  দিনার খানের সময় হয়ে উঠে না তার হাই-হ্যালোর জবাবে সাড়া দিতে। এতে শিরিন বিরক্তও হচ্ছে। তাই আজ সে হাই-হ্যালো না করে প্রথমেই বিরক্তিবোধ প্রকাশ করে ম্যাসেজে লিখে,
.
-আপনি সারাক্ষণ ফেসবুকে ব্যস্ত থাকেন কেন ? মনে হয় অন্য কোন মেয়ের সাথে চ্যাটিং এ বসে মাছরাঙ্গা পাখীর মত একধ্যানে ওর টাইপিং এর দিকে তাকিয়ে থাকেন মেয়েটির থেকে কখন পজেটিভ জবাব আসে ! তাই না ?
.
-কাউকে না জেনে এভাবে বলা একদম অশোভনীয় । তাছাড়া আপনার সাথে আমার নতুন পরিচয়। আপনিও আমাকে ভালভাবে চেনেন না, আমারও আপনাকে ভালভাবে জানা হয় নি।  না জেনে এভাবে বলা ঠিক নয়।
.
-মাইন্ড করেছেন ? সরি, ভাইয়া সরি !
.
-কিছু বলবেন ?
.
-আপনি এখন ফ্রি আছেন কি ?
.
-ফ্রি হয়ে উঠা সম্ভব হয় না। আমি নিউজ তৈরী, তা পত্রিকায় পোস্ট দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি। সময় হলে গল্প বা অন্য বিষয়ে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। যাক,  আপনার জন্য না হয় এখন ফ্রি হয়ে নিলাম। বলুন-
.
-না থাক, ফ্রি হওয়া লাগবে না। আপনি যেহেতু ব্যস্ত রিপোর্টার, অযথা কথা বলে আপনার সময় নষ্ট করবো না।
.
-আমি যে রিপোর্টার এটা আপনি কীভাবে জানলেন ?
.
-বাহ্ রে, পরশু দিন আপনিই বলেছিলেন, আপনি রিপোর্টার ও গল্প লিখেন।
.
-ও আচ্ছা, মনে পড়েছে। আপনাকে একটা গল্পের লিংক দিয়েছিলাম, গল্পটা পড়েছেন ? কোন মন্তব্য করলেন না তো ?
.
-‘’কাকের সাবান চুরি’’ গল্পটা তো ?
.
-হ্যাঁ ।
.
-ওটা আমি পড়েছি। মন্তব্য জানাতে ভুলে গিয়েছি,  সরি ভাইয়া !
.
-আমরা যে যেমন পেশায়ই যুক্ত থাকি না কেন, আমরা প্রত্যেকেই চাই, আমাদের সেই পেশার কাজের বিষয়ে লোকে একটু প্রশংসা করুক।
x একটা সত্যি কথা বলুন তো ? আপনি যখন দেশ ভ্রমন পছন্দ করেন, তখন সেই ভ্রমনের ছবিটার নিচে যদি কেউ একজন  প্রশংসা করে তাহলে আপনার কি মনে হয় না, যে পরের ভ্রমনের ছবি ও লোকেশন আরও যেন সুন্দর হয়।
x আপনি তো এমনিই খোদা প্রদত্ত সুন্দরী, এরপরও কেউ একজন আপনার রূপের প্রশংসা করলে কেমন লাগবে ?
.
-হ্যাঁ, অবশ্যই ভাল লাগবে।  আর এটা সবার বেলায় হয়।
.
-কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা মানুষকে প্রশংসা করতে বড্ড কিপটেমি করি। কাউকে প্রশংসা করতে আমরা আসলে ভয় পাই, আমরা তো সকলেই জানি কাউকে যদি ক্রমাগত প্রশংসা করা যায় তাহলে সে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
x আর এখানেই আমাদের সমস্যা ! আমরা তো সব সময় লাভ ক্ষতির হিসাব করি, আমরা আমাদের অবচেতন মনে এটা ভাবি, অন্যকে প্রশংসা করে আমার কী লাভ? এতে আমার কী কোনো উপকার হবে!
.
-আমি মনে করি, যে খুব ভাল তাঁকে যতটা প্রশংসা করা উচিত, তার থেকেও বেশি প্রশংসা করা উচিত যে একটু পিছিয়ে আছে তাঁকে। এতে যে পিছিয়ে আছে সে এগিয়ে যেতে একটু মনোবল ফিরে পেলে আমার তো কোন ক্ষতি নেই।
.
-আমি গল্প লেখায় নতুন, বলা চলে লকডাইনে বাসায় অলস সময় কাটাতে গল্প লেখায় হাত দিয়েছি। এর আগে হয়তো কখনও ভাবি নি আমি গল্প লিখব।
x  আমরা কিন্তু প্রতিটা মানুষই এমনই যে অন্যের প্রশংসা করতে মনের মধ্যে এক অদ্ভুত হিংসার জন্ম হয় – লোকটা বুঝি আমার চেয়ে অনেক ওপরে উঠে যাচ্ছে। তাই আমরা প্রশংসা করতে কৃপনতা করি।
.
-আবারও সরি বললাম ভাইয়া ! ‘’কারও যদি কোন গুন নাও থাকে তাহলেও তাঁর যে গুন আছে বলে প্রশংসা করা যায় তাহলে সে তাঁর ঐ খ্যাতি কে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করবে’’- এটুকু আমি জানি ও বুঝি।
x আপনার আরও একটা গল্প আমি পড়েছি, ‘’যাত্রাপথের সঙ্গী’’ ওটাও ভাল লেগেছে।
.
-পরের গল্পটা আপনাকে নিয়ে লিখবো বলে ভাবছি, যদি আপনার সন্মতি থাকে।
.
-আমাকে নিয়ে??
.
-আজ কয়দিন থেকে আপনার সাথে আমার চ্যাটিং হচ্ছে। আপনার সাথে পরিচয়, পরিচয় থেকে কথোপকথন, এরপর কাছাকাছি হওয়া, মনের গল্প বিনিময়, এতেই হয়তো একটা বাস্তব গল্প হয়ে যাবে।
.
-থাক, লাগবে না। আমি এমন সেলেব্রেটি কোন মেয়ে নই, অন্য কাউকে নিয়ে লিখেন।
.
-বুঝলাম না।
.
-সহজ কথা না বুঝলে গল্প লিখবেন কীভাবে ? কিছু কথা নিজেদের ভিতরে থাক না,পাবলিককে জানানোর কী দরকার!
.
-ছদ্ম নামে গল্প লিখব। কেবল আমি ও আপনি ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না। লেখক ও নায়িকার  অনুমতি থাকলে সরাসরি নাম পরিচয় দিয়েও লেখা যায়।
.
-আপনি নায়িকা পেলেন কোথায় ? আমিতো খল অভিনেত্রী।
.
-আপনাকে না হয় আমার পরবর্তী গল্পের নায়িকা বানিয়ে নেব।
.
-খল চরিত্র থাকলে বলেন ! তাহলে অভিনয় করতে পারি।
.
-আপনার মত সুন্দরী, স্মার্ট, শিক্ষিত মেয়ে নায়িকা হবেন না তা কী ভাবা যায় ?
.
-আমি সুন্দরী না, ছাঁই !
.
-আপনার আইডি ঘুরে দেখেছি, আপনার ছবিগুলো দেখে আমি খুবই মুগ্ধ। বাঙ্গালি সুন্দরী মেয়েদের মধ্যে আপনিও একজন। মাইন্ড না করলে আমার একটা কৌতুহলের জবাব দেবেন কী ?
.
-বলেন, আপনার এমন কৌতুহল কী এবং কেন ?
.
-আপনি বিয়ে করেছেন ?
.
-লেট ম্যারিজ, তাও পাঁচ বছর আগে।
.
-তার মানে আপনি ত্রিশের পর বিয়ে করেছেন, আপনার বয়স এখন পঁয়ত্রিশ ধর ধর ?
.
-ঠিক ধরেছেন। চৌত্রিশ প্রায় শেষ।
.
-ছবি দেখে মনে হয় না, খুবই তরুনী লাগছে। আমি ভেবে ছিলাম, আপনি এখনও বিয়ে করেন নি। পেশা কী আপনার ?
.
– একটি দপ্তরে ছোটখাট একটা জব করে কোন মতে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছি।
.
-আপনার সাহেব কী করেন ?
.
-একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো না জানা ভাল। তাছাড়া আমাদের সবার মধ্যেই কিছু চাপা কষ্ট লুকিয়ে থাকে। আপনজন ছাড়া  সেই কষ্টগুলো অন্যের  সঙ্গে শেয়ার করা উচিৎ না।
.
-সরি ! এত গভীরে যাওয়া আসলে আমার উচিৎ হয় নি। আপনি ঠিকই বলেছেন চাপা কষ্ট সবারই থাকে । কারও বেশী , কারও কম। আমি ভেবে ছিলাম আমার আর আপনার জীবনের যত কষ্ট আছে আমরা সব এইখানে শেয়ার করব।
.
-ব্যক্তিগত বিষয় অল্প পরিচিতিদের সাথে শেয়ার করা উচিৎ নয়।
.
-আপনাকে নিয়ে একটা গল্প লিখার চিন্তা করছি। তাই লিখতে হলে আমাকে আগে আপনাকে জানতে হবে। গল্পটা লিখা শুরু করতে পারি ?
.
-অচেনা লোককে নিয়ে গল্প লিখা যায় না।
.
-প্রতিদিন আপনি আমাকে এক ঘন্টা চ্যাটে সময় দেবেন। আলাপের মাঝে আপনাকে জানা হয়ে যাবে। জানতে  জানতেই গল্পের কাহিনী তৈরী হয়ে যাবে। এই গল্পটি হবে আপনার আর আমার জীবনে ঘটে যাওয়া বাস্তব একটি গল্প।
.
-ঠিক আছে আপনি লিখুন, তবে একটা শর্ত আছে !
.
-এমন কী শর্ত যা আমি পূরণ করতে পারবো না ? শর্তটা বলুন।
.
-লেখা শেষ করে আজকে রাত ১১টার আগে আমার ইনবক্সে পাঠাতে হবে, পারবেন ?
.
-গল্পের কাহিনী এখনও আমরা শুরুই করি নি, কাহিনীর আগে গল্প লিখা কীভাবে সম্ভব ! ঘটে যাওয়া কাহিনী নিয়ে গল্প হয়। তাই আমি আর আপনি আগে কাহিনী রচনা করি, পরে এ কাহিনী নিয়ে গল্প লিখা শুরু ও শেষ করবো।
.
-আমাকে নিয়ে গল্প লিখবেন ! আমার আইডি তো ফেইক ! আমি ছেলে।
.
-আমি আপনার আইডিতে ঘুরে সব পর্যবেক্ষণ করেছি। আপনি ছেলে না। একজন ছেলে কখনো গল্পের নায়িকা হতে পারে না, কারণ এখানে আবেগ আছে, দৈহিক আকাঙ্খা আছে।
.
-ওঃ মোর খোদা, এই আম্মে এগিন কিয়া কন! বিদায় বন্ধু বিদায়।
.
সবুজ আলো নিভিয়ে হঠাৎ চ্যাট থেকে চলে গেল শিরিন। দিনার খানের কপালে যেন হতাশার ভাঁজ পড়ে । মেয়ে সেজে দুষ্টমি করছে না তো ? তাই আবারও দিনার খান শিরিনের আইডি ঘাটতে থাকে। টাইমলাইনে অনেকগুলো পোস্ট ও কমেন্টস দেখতে পায় দিনার খান । কমেন্টস দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে এরা মেয়েটির খুবই পরিচিত। না, এটা কোন ছেলের আইডি হতে পারে না। বিদেশ সফরের বেশ কয়েকটি ছবিতে অসংখ্য কমেন্টস। ‘’শিরিন তুমি কবে গিয়েছিলে ? সরকারী সফরের মজাই আলাদা। গত কাল তোমাকে তোমার অফিসে খুঁজতে গেলাম, জানতে পারলাম তুমি নাকি এখন ভিয়েতনাম গিয়েছ,  ইত্যাদি।‘’  দিনার খান ফেইক আইডির কোন নিদর্শন খুঁজে পায় নি। ফটো গ্যালারীতে বারটি বিভিন্ন পোজের ছবিও শোভা পাচ্ছে। এরমধ্যে চারটি ছবি বিদেশ গিয়ে তোলা। প্রতিটি ছবি যেন কোন মডেল কন্যার ছবি। যেমন তার রূপ, তেমনি শরীরের গঠন। অবিকল দীপিকার চেহারার মত হলেও বয়সে টিন এজারের মত মনে হচ্ছে।  এসব ভাবতে ভাবতে আবার শিরিনের নামের ওপর সবুজ আলো দেখে নড়ে চড়ে বসে দিনার খান।
.
-রাতের খাবার খেয়েছেন ? শিরিন জানতে চায়
.
-খেয়েছি। আপনি ?
.
-আমিও খেয়েছি। সারাদিন সেমিনারে ছিলাম। বড্ড ক্লান্ত। আপনি এখনো নেটে আছেন দেখে নক করলাম।
.
-ভালই হলো। ধন্যবাদ নক করার জন্য।
.
-আমি যে ছেলে এটা এখনো আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না। ?
.
-কখনোই না। তাহলে আপনার একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে কিছু একটা লিখে আপনার টাইমলাইনে স্ট্যাটাস দিন। দেখি কমেন্টসে কে কী মন্তব্য করে ?
.
-তাহলে একটু অপেক্ষা করুন, আমার বেশ কয়েকটি ছবি পাঠাচ্ছি, যেগুলো এখনো ফেসবুকে আপলোড করি নি। করবও না। কারন শিরিন নামের আইডিটা একজন ছেলে চালাচ্ছে।
.
-পাঠিয়ে দিন তাহলে।
.
ফটাফট শব্দে আটটি ছবি এলো ইনবক্সে। দিনার খান ছবিগুলো একটা একটা করে জুম করে দেখে নেয়। সবগুলো ছবি শিরিনের। ফটো গ্যালারীতে থাকা ছবিগুলোর চেহারা আর এখন পাঠানো ছবি একই মেয়ের।
.
-ছবিগুলো দেখেছেন ? কী বুঝলেন ?
.
-হ্যাঁ, দেখেছি। যার আইডি তারই ছবি।
.
-একদম ঠিক বলেন নি। এগুলো আমার না। ছবিগুলো সব ধার করা। আমি ছেলে।
.
-বিশ্বাস করতে পারছি না।
.
-কেন বিশ্বাস করতে পারছেন না ? আরো ছবি দেব, অপেক্ষা করুন।
.
-দিন, আমি অপেক্ষায় থাকলাম।
.
কিছুক্ষণ পরে আরো দশটা ছবি এলো। বিভিন্ন পোজ ও লোকেশনে তোলা একই মেয়ের ছবি।
.
-এখনো বিশ্বাস হয় নি আপনার ?
.
-কেন বিশ্বাস করবো ? সবগুলো আপনারই ছবি।
.
-বিশ্বাস না করলে আমার কিছুই যায় আসে না। আমি দেশে ফিরলে কথা হবে।
.
-আপনি এখন কোথায় ? কখন ফিরবেন ?
.
-আমি এখন ভিয়েতনাম, আরো পাঁচ দিন পর ফিরবো। ওকে বিদায়। ভাল থাইকেন। শুভরাত্রি।
.
আট দিন পার হয়ে গেল, কখনো  শিরিনকে নেটে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে না। দিনার খান বার বার ম্যাসেজ অপশনে লিখছে, আপনি দেশে ফিরেছেন ? আট দিন অপেক্ষা করে পরের দশ দিন প্রতিদিনই একবার ম্যাসেজ অপশনে লিখছে, আপনি দেশে ফিরেছেন ? একটা ম্যাসেজও ওপাশ থেকে সিন করা হয় নি। শিরিন কী তাহলে হারিয়ে গেল ? একমাস কেটে গেল। হঠাৎ শিরিনের নামের ওপর সবুজ সিগন্যাল দেখে দিনার খান নিজ থেকে আগবাড়িয়ে ম্যাসেজ লিখে, বন্ধু আপনি কী এখনো জীবিত আছেন ? এক মাসের বেশি সময় ধরে নিঁখোজ ছিলেন যেন !
.
-আমি মারা গেলে আপনি খুশি হতেন ?
.
-তা হবো কেন, আপনাকে না পেয়ে মনটা ভাল যাচ্ছিল না।
.
-আহা রে! আমার সোনাধন। মনে রাইখেন, “একজন ছেলে কখনো অন্য ছেলেকে ভালবাসা দেখায় না, কারণ ভালবাসায় আবেগ আছে, আকাঙ্খা আছে। সুতরাং আহলাদ দেখাবেন না, কেটে পড়েন। আমাকে একা থাকতে দিন। আমি সরকারী জব করি। প্রেমে উৎলে উঠার সময় আমার নেই।
.
-বলতে চেয়েছিলাম আপনি মনে হয় ফেসবুকে কমই আসেন !
.
-এটা নিয়ে আপনার মাথা ব্যথা কেন ? আর কিছু বলতে চাইলে সোজা ব্লক মেরে দেব। ঠিক আছে, আপনি এখন যেতে পারেন। সময় হলে আমিই নক করবো আপনাকে। ওকে বাই।
.
কিছুদিন পর শিরিন নিজ থেকেই নক করলেন দিনারকে। আপনি কেমন আছেন ?
.
-জ্বি ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?
.
-ভালই আছি। আপনি মনে হয় প্রায়শ: আমার অপেক্ষায় চ্যাটে বসে থাকেন?
.
-বুঝতে পারার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
.
-আমি ভিয়েতনাম থেকে এসে সপ্তাহ পর আবার দেশ ছেড়েছি। গত পনের দিন কানাডায় ছিলাম, অফিসিয়াল সফরে।
.
-আমি ভাবছিলাম আপনি অসুস্থ, বিশ্বে এখন করোনা মহামারি চলছে। কে কখন কাউকে না জানিয়ে বিদায় নেয় জানতে পারবো না। যাই হোক আপনি সুস্থ আছেন এটাই সান্তনা। সুস্থ থাকার জন্য দোয়াও করেছি।
.
-তাই ! আমার জন্য ?
.
-জ্বি, আপনি কিসে জব করছেন?
.
-এক্সচেঞ্জ কমিশন-এ। এর বেশি আপাতত জানার প্রয়োজন নেই। ওকে ভাল থাকেন।
.
আধা ঘন্টা পর আবার শিরিনের নক।
.
-কী করছেন বন্ধু ?
.
-এই তো, ল্যাপটপ খুলে গল্প লিখতে বসলাম।
.
-সরি ! ডিস্টার্ব করলাম !
.
-ডিস্টার্ব হচ্ছে না, বলুন –
-আপনাকে আর চিন্তা করতে হবে না, আমি প্রতি বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত এ আড়াই দিন নেটে কিছুক্ষণ সময় দিতে পারব। অন্য দিনগুলোতে আমার কাজের চাপ থাকে। ফেসবুকে আসার সময় হয় না। একটা আবদার করব ?
.
-কী সেটা ?
-আপনার একটা ছবি পেতে পারি ?
.
-অবশ্যই। এক্ষুণি দিচ্ছি। দিনার খান একটার পরিবর্তে তার ৫টি ছবি পাঠিয়ে দেয় শিরিনের ইনবক্সে।
.
-কী ছবি পাঠিয়েছেন, এগুলো তো মেয়েদের মত ছবি।
.
-কেন মেয়েদের ছবি হবে ? আমার ছবিই পাঠালাম।
.
-যদিও দেখতে মেয়েদের মত, তবে খুবই সুন্দর ফিগার।
.
-ধন্যবাদ। আমার চোখ ব্যতিক্রম তাই না ?
.
-আমার চোখও আপনার মত। ছবিগুলো জুম করে দেখলে বুঝতে পারবেন।
.
-কেন ? আপনার পাঠানো ছবিগুলো ধার করা বলেছিলেন না ? এগুলো আসলেই আপনার ছবি ?
.
-সরি ! ওই ছবিগুলো আমার না। আচ্ছা বন্ধু বিদায়, এ মুহূর্তে আমার সামনে একগাদা ফাইল এসে জমা পড়েছে। সবগুলো সই করে বিকালের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে। বাই বাই
.
সপ্তাহ পর আবারও শিরিনের নক :
.
-কেমন আছ তুমি ?
x দু:খিত, ভুলে তুমি লিখে ফেলেছি।
.
-ভালো। আপনি কেমন আছেন ? তুমি বলাতে দু:খিত হওয়ার কিছুই নেই।
x খুশি হলাম। আমাকে অনুমতি দিলে আমিও তুমি বলবো। এতে সম্পর্কের দূরত্ব কমবে।
.
-বেঁচে আছি,আলহামদুলিল্লাহ্! আমাকে তুমি করে বলা সেটা আপনার ইচ্ছে।
.
-তুমি থেকে আবার আপনি কেন ? তুমিই করে বল।
.
-আচ্ছা, বলব নি।
.
-তোমাকে পাচ্ছিনা সেই অনেক দিন থেকে।
.
-কাজের চাপ।
.
-তাই বলে শুক্রবারও ?
.
বিরক্তিবোধ প্রকাশ করে শিরিন বলে, শুক্রবার কী মানুষ ঘরে শুয়ে কাটায় ?
.
-একজন কাছের বন্ধুকে না পেলে মন ভাল থাকে ?
.
-বন্ধু ! কেমন বন্ধু জানতে পারলে উত্তর দেওয়া সহজ হত !
.
-আমি খুব কাছের বন্ধু হতে চেয়েছিলাম। তোমার সাথে পরিচিতি হওয়ার পর খুব ভাল লেগেছে। স্মার্ট ও স্পষ্টবাদী, সুন্দর ফিগার ও সুন্দর মন সব মিলিয়ে তুমি সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি।
.
-কতটা কাছের বন্ধু ?
.
-সেটা বিবেচনা করার ক্ষমতা একমাত্র তোমার। এক তরফা বন্ধুত্ব হয় না। আমি চাচ্ছি খুব, তুমি বন্ধু হিসেবে মেনে নিলেই হলো।
.
-কিছু কথা বলছি মন দিয়ে শোন, ফেসবুকে রিয়েল আইডির সংখ্যার থেকেও ফেইক আইডির সংখ্যা ব্যাপক। মনে করো আমিও ফেইক। সেক্ষেত্রে তোমার এই বন্ধু হবার ইচ্ছা কী এখনো আগের মতোই থাকবে ?
.
-বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছি তো ?
.
-আমার উত্তর এখনো পাইনি। আগে বল, ফেইক আইডির সাথে বন্ধু হবার ইচ্ছা কী এখনো আগের মতোই থাকবে ?
.
-ফেসবুকে অসংখ্য ফেইক আইডি থাকে এটা আমিও বিশ্বাস করি। কিন্তু তোমার আইডি ফেইক না। ফেইক হলেও তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।
.
-তুমি কি জেনে শুনে মরিচিকার পিছনে ছুটবে ?
.
-দোষ কী তাতে ? মরিচিকা হয়তো নয় এটাই আমার নির্ভুল ধারনা। ভুল করি নি আমি। তোমার সাহেব কেমন আছেন?
.
-ভালো। কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন ক্যানো ?
.
-আমি যে তোমর আইডি ঘেটেছি তার প্রমান দিতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে সাহেবের বিষয় জানতে চেয়েছি, অন্য কিছু না। ডো’ন্ট মাইন্ড। আমি তো উনাকে চিনিও না। তবে উনি রাজনীতি করেন, তাই না ?
.
-আইডি ঘেটে কী বুঝলে ?
.
-ভাল ও রক্ষণশীল একজন বন্ধু হিসেবে বুঝলাম তোমাকে।
.
-আইডি যে ফেইক এটা বুঝতে পার নি ? এখন বলো,তোমার কি এখনো বন্ধু হবার ইচ্ছা আছে?
.
-অবশ্যই আছে ?
.
-তুমি একটা আজব প্রাণী , না হয় আইন্নালাছা। আর কতক্ষণ নেটে থাকবে তুমি ?
.
-তুমি বললে সারা রাত। আর না হয় একটু পরে উঠে যাবো।
.
-ঠিক আছে থাকো।
.
-হ, তোমার কথা রাখলাম। সারা রাত ল্যাপটপের সামনে চেয়ারে বসে মশার কামড় খেতে রাজি।
.
-এখন রাত ১০ টা, ১২টায় নেটে আসবো। আমার জন্য অপেক্ষা করবে। কেমন ?
.
-ঠিক আছে, অপেক্ষায় থাকবো।
শিরিনকে বিদায় দিয়ে দিনার খান তার গল্প লেখায় মনোযোগ দেয়। একটার পর একটা হাঁচি দিচ্ছে সে, হঠাৎ যেন সর্দি চেপে বসে। তাই একসাথে দুটো হিস্টাসিন ট্যাবলেট গিলে নেয়। ১২টার আগেই হিস্টাসিনের এ্যাকশন শুরু হয়ে যায়। ল্যাপটপ খোলা রেখেই চেয়ারে গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সে। এদিকে রাত সাড়ে ১২টায় চ্যাটে এসে দিনার খানকে না পেয়ে তার মনের একান্ত কথাগুলো জানিয়ে দিনার খানকে ম্যাসেজ দেয় শিরিন :
-প্রথমত,আমার কথা যদি অন্য কেউ উচ্চারণ করে ফেলে নতুন করে- সে কথা উচ্চারিত হলে পুনরুক্তি দোষে দুষ্ট হবে-সেক্ষেত্রে পুরনো সেই কথামালা বর্ণিত হওয়াই সঙ্গত, ‘নিয়তি তোমার আত্মীয় বেছে দেয়, আর তুমি বেছে নাও তোমার বন্ধু’। এমন ক্ষেত্রে আমিও পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ মায়াকোভন্বিকে স্মরণে নেবো, তার লেখা এই কবিতাটি প্রেয়সী লিলিয়া’কে উদ্দেশ্য করে, কবিতাটির নামও লিলিয়া। ‘লিলিয়া’ আমি ভালোবাসি ভালোবাসি কোন বাঞ্ছি বিচার ছাড়াই সবকিছু মেনে নিয়েই ভালোবাসি ভালোবাসব । তুমি আমার সঙ্গে রূঢ় হও, কি আদরে ভরে দাও আমায়, তুমি আমার হও কিংবা হয়ে যাও দূরের কেউ যাই ঘটুক না কেন, ভালোবাসি।
x আশা করি, তুমি আমার উত্তর পেয়ে গেছো !
x ১২টা ৫২ মিনিট
x ১টা ৩০ মিনিট
x ২ টা,আর অপেক্ষা করা যায় না। তুমি আজ সারা রাত আমাকে সময় দেওয়ার কথা ছিল। কথা দিয়ে কথা রাখ নি, মনে ভীষণ কষ্ট নিয়ে নেট থেকে চলে গেলাম।
.
শুক্রবার সকাল দশটায় শিরিন আবার নেটে আসে। দিনার আগে থেকেই শিরিনের পাঠানো পাঁচটি ম্যাসেজ পড়ে নেয়। শিরিনের অপেক্ষায় বসে আছে। তার নামের পাশে সবুজ সিগন্যাল দেখে দিনার লিখে,
.
-রাত ১২টার পর তোমার সবুজ সিগন্যাল না দেখে ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে গেছো। দুঃখিত বন্ধু।
.
-আমি ঘুমিয়ে গেলেই কি ! তুমি তো বলেছিলে সারা রাত জাগবে, তোমার উচিত ছিলো জেগে থাকা।
.
-সরি! বন্ধু সরি ! আমি ভালোবাসি ভালোবাসি কোন বাঞ্ছি বিচার ছাড়াই, সবকিছু মেনে নিয়েই ভালোবাসি, ভালোবাসব, তুমি আমার সঙ্গে রূঢ় হলেও। তবে সেটা কেবল বন্ধু, বন্ধু,, বন্ধু। এর বেশি আগানো ঠিক নয়। তবে তুমি চাইলে আমি না করবো না।
.
-এর বেশি আগানো ঠিক নয় বলতে কী বুঝাতে চেয়েছ তুমি ?
.
-তুমি বিয়ে করেছ, আমিও করেছি। আমাদের দু’জনেরই কারো স্বামী ও কারো স্ত্রী আছে। সন্তানও আছে অনেকগুলো।
.
-তুমি আবার এটাও বলেছিলে, আমি চাইলে তুমি না করবে না। সেটা আবার আগের কথার সাথে কেমন যেন সাংঘর্ষিক হচ্ছে না ?
.
-ধর, আমার তেতুল খাওয়া একদম নিষেধ। তবুও কোন কারনে তেতুল হাতে এসে গেলে জিবে পানি আসবেই। হয়তো একসময় সেই তেতুল জিবের সাথে একাকার হয়ে খাদ্য নালীর ভিতর দিয়ে হৃদয়ে পৌঁছে যাবে। তাছাড়া যে ফল খেতে মানা তার প্রতি অগ্রহ জন্মে অনেক বেশি। যেমন বারণ থাকা সত্বেও আদম-হাওয়া নিষিদ্ধ ফল খেয়েই ফেললো।
.
-ছাড় তোমার এসব যুক্তি। শুন দিনার, কাল সকালে পটুয়াখালী যাব।
.
-ওখানে কেন যাবে ? বেড়াতে ?
.
-না, এক কলিগের বিবাহ অনুষ্ঠানে যাব।
.
-মজা হবে তাহলে। কয়দিন থাকবে ?
.
-হয়তো দুই দিন। এখন তোমাকে বেশি সময় দিতে পারবো না, কারণ খুব ভোরে বের হব। তাই এখন ঘুমাতে যাব।
.
-সফরের আগের রাতে এমনিতেই ঘুম হওয়ার কথা না। ভ্রমনের পূর্ব শিহরণ ঘুম কেড়ে নেয়।
x তবুও ঘুমানোর চেষ্টা থাকা ভাল। যাও ঘুমাও ।
.
-আমার এরকম কোনো ফিল হয়না।
.
-তুমি তো সুখী মানুষ। ঘুম তো আসবেই।  যাও ঘুমাও ।
.
-তোমাকে নেটে একা রেখে আমার ঘুমাতে ইচ্ছে করে না।
.
-তাই ! শোন, মানুষের জীবনে ঘুমটা এক অসাধারণ জিনিস। যদি আসে দুনিয়ার সব ভুলিয়ে দেয়, আর যদি না আসে সব কিছু মনে করিয়ে দেয়।
.
– তা ঠিক বটে। তোমার গল্প লেখায় কতদূর এগিয়েছ ?
.
-প্রেমোলজিস্ট নামে একটি গল্প লিখার কাজে হাত দিয়েছি তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার আগে।
x এটা শেষ হলে তোমাকে নিয়ে লিখবো।
x আচ্ছা মেয়ে তো তুমি ! ঘুমাতে যাচ্ছ না কেন ? একটার বেশি বাজছে, ভোরে উঠতে হবে না ?
.
-ওকে, শুভরাত্রি।
.
-তুমি পটুয়াখালী পৌঁছে আমাকে নক করিও। বাই
.
পরদিন সন্ধ্যায় দিনার খান নেটে এসে দেখে শিরিনের অনেকগুলো ম্যাসেজ ও পটুয়াখালী ভ্রমনের অনেকগুলো ছবি। শিরিন লিখেছে:
-বন্ধু বড্ড ক্লান্ত। আমি পৌঁছে গেছি।এখন কুয়াকাটায় আছি।
x ড্রাইভার ছুটিতে। তাই গাড়ি নিজে ড্রাইভ করায় ক্লান্ত।
x কাল সন্ধ্যায় ফিরবো।
x এখানে খুব ব্যস্ত সময় পার করছি।
x তাই নেটে আসতে পারছি না।
x অনেকগুলো ছবি পাঠালাম।
x ছবিগুলো কেমন হয়েছে জানাবে।
x ভাল থাইকো বন্ধু।
.
দুই দিন পর শিরিন পটুয়াখালী থেকে ফিরে রাতে আবার চ্যাটে আসে।
.
-কেমন আছ বন্ধু ?
.
-শারীরিক ভাবে ভাল আছি। মনের দিক থেকে ভাল ছিলাম না।
.
-কেন ?
.
– এই যে তুমি হারিয়ে গেলে ! কখন ফিরেছ ?
.
-সকালে ফিরেছি। এসেই লম্বা একটা ঘুম দিলাম।
.
-তুমি গাড়ি চালাতে পার ?
.
-কেন পারবো না, ওটা আমার নিজের গাড়ি।
.
-বন্ধু অনেক দিন হয়ে গেল, তোমার মোবাইল নম্বরটা এখনো দাও নি। দেবে এখন ?
01716xxxxxx এটা আমার নম্বর।
.
-পটুয়াখালীতে তোলা ছবিগুলো কেমন হলো ?
.
-প্রতিটি ছবি,মুড,লোকেশন,ফিগার খুব চমৎকার।
x তাই প্রতিটা ছবি সংরক্ষণে রেখে দিয়েছি।
.
-তাই !
.
-মাথায় ফুল দিয়ে সাজানো ছবিটা এত বেশি চমৎকার, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। ছবিগুলো দেখে খুবই তুষ্ট হয়েছি ।
x তবে কষ্ট পাই তখনি যখন তোমাকে দীর্ঘ সময় খুঁজে পাই না। কাজের চাপ মানুষকে এতটা দূরে সরিয়ে নেয়?
.
-ছবি দেখে তুষ্ট হওয়ার কী আছে ? এগুলো আমার ছবি না। পটুয়াখালী থেকে ধার করা।
.
-আবারও নিজকে লুকানোর সেই ফালতু দাবি ?
.
-ছবি কোনটা কেমন লেগেছে খুলে বল।
.
-তোমাকে শাড়ির চেয়ে থ্রিপিচে বেশি মানিয়েছে। তাই বলে শাড়িও খারাপ না। সবশেষে বলতে হচ্ছে তুমি ভারতীয় নায়িকা দীপিকার চেয়েও কোন অংশে কম না। এমন একজন নায়িকার বন্ধু হতে পেরে নিজকে ধন্য মনে করছি।
.
-দীপিকার সাথে তুলনা করে অপমান করলে !
x আমি জানি তুমি যতটা বলছে আমি ওরকম কেউ নই।
x আমি একজন সাধারণ মেয়ে।
.
-কথায় আছে না, সাত দিন চোরের একদিন গৃহস্তের।
.
-বুঝলাম না।
.
-নিজকে ছেলে দাবি করছ, আর একটু আগে বলে ফেলেছ আমি একজন সাধারণ মেয়ে।
.
-ভুল হয়ে গেল। ছেলে মেয়ের প্রসঙ্গ এখন রাখ। ছবি নিয়ে কথা বল। অতিরিক্ত বানিয়ে প্রশংসা করার প্রয়োজন নেই। জেনে রাখ, তুমি যত বেশি প্রশংসা করবে তত বেশি তোমার প্রশংসার গুরত্ব কমবে।
.
-আমি বানিয়ে বলি নি। যা সত্য তা বলেছি।
x শেষের ছবিটায় আমার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এটাও কী বানিয়ে বলেছি?
x ছবিটা একবার দেখে অফ করার পর আবার ওপেন করেছি। এভাবে ছয় বার দেখলাম। আরো কতবার দেখতে হবে জানি না।
x তোমার রূপ-লাবণ্য সত্যি অপূর্ব যা কারো সঙ্গে তুলনা হয় না।
x তোমাকে একবারের জন্য হলেও সরাসরি দেখার সৌভাগ্য হলে জীবনটা স্বার্থক হতো।
x আহা মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল তোমার ছবিগুলোতে চোখ বুলিয়ে, ওহে বন্ধু নিভৃতে যতনে তোমার নামটি লিখে রেখেছি আমার হৃদয় মন্দিরে।
x সবুজ আলো নিভিয়ে কই গেলে বন্ধু ?
x হ্যালো !
.
-তোমার উপর রাগ করে চলে গেলাম। কেন আমাকে দীপিকার সাথে তুলনা করে অপমান করলে ! রাগ করে থাকতে পারলাম না।
.
-নিজের সৃষ্ট রাগ নিজ থেকে ভাঙ্গার জন্য ধন্যবাদ।
.
-ঠিক আছে বন্ধু, অনেক রাত হয়ে গেল। সকালে অফিসে যেতে হবে।
.
-ওকে, বিদায় । ভাল থেকো।
.
কাজের চাপে শিরিনের চ্যাটে আসার সুযোগ কমই হয়। সকাল নয়টায় তাকে একচেঞ্জ  অফিসে যেতে হয়, আবার বাসায় ফিরতেও রাত নয়টা বেজে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে  বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে কমিশন এক্সচেঞ্জে চাকরী নেয়। সে এখন একজন বড় কর্মকর্তা।
.
দশ দিন পর শিরিন চ্যাটে এলো। দিনার খান শিরিনের নামের ওপর সবুজ আলো দেখে চমকে উঠে। অনেকদিন পর শিরিনকে পেয়ে ম্যাসেজ পাঠায়:
-তোমাকে বেশ কয়দিন পাহারা দিচ্ছি, নেটে আসছোনা ক্যান ?
.
-এখন আসলাম, আবার চলেও যাব।
.
-কেন যাবে ? তোমাকে এমনিই তো পাওয়া যায় না।
.
-ঘুম চেপে আসছে তাই। খুবই ক্লান্ত।
.
-এভাবে ধূমকেতুর মত এসে কষ্ট দিয়ে চলে যাও কেন বন্ধু ?
x কষ্ট পেতে পেতে বুকটা কেমন যেন পাথর হয়ে যাচ্ছে।
x ঘুম না আসার ঔষধ খাও, ঘুম চলে যাবে।
.
-এভাবে বলছো ক্যানো ? তোমার আত্মার শান্তির জন্য আমার বিশ পঁচিশটি ছবি পাঠাচ্ছি।
x এগুলো দেখতে দেখতে হয়তো রাত কেটে যাবে।
x আর শুন, কাল থেকে আরো পাঁচ ছয় দিনের জন্য আমাকে তুমি পাবে না। অফিসের কাজে কক্সবাজার যাব।
.
-বন্ধুকে কষ্ট দিয়ে এত ঘোরাঘুরি করা ঠিক না। কখন যাচ্ছো ?
.
-কাল সকাল সাতটার ফ্লাইটে।
.
-খুবই কষ্ট পেলাম। এই এসেই আবার ফুড়ুৎ !
.
-কী করবো সবই নিয়তি। ধৈর্য ধারন কর, একদিন ফল পাবে। ওকে, বিদায়। ভালো থাইকো। বাই বাই।
.
ছয় দিন পর একদিন রাতে শিরিন চ্যাটে এসে দিনার খানের ম্যাসেজে বেশ কয়টি ছবি প্রেরণ করে। অধিকাংশই কক্সবাজারের আর দুটি বিমানে উঠার ছবি। একটি ঢাকা ও অপরটি কক্সবাজার এয়ারপোর্টের। দিনার খান ভাবছে, আইডি যদি ছেলেরই হয় তাহলে কথার সাথে মিলিয়ে ঘটনা, আবার সেই ঘটনাস্থলের বিভিন্ন ছবি। এতগুলো ছবি ধার করা যায় না। ইতোমধ্যে দিনার খানের ইনবক্সে শিরিনে প্রায় দেড় শতাধিক ছবি এসে ঢুকেছে। যা দিনার খান  ফটো ড্রাইভে সেভ করে রেখেছে। এই ধরণের একটিভ আইডি যদি ফেইক হয় তাহলে অন্য সব আইডিই ফেইক। দিনার খান নেটে ঢুকে শিরিনকে খুঁজে পায়। শিরিনের অনেকগুলো ম্যাসেজ এসে জমা হয়েছে তার ইনবক্সে।
-হ্যালো !
x কোথায় তুমি ?
x তুমি জানো, আমি খুব ব্যস্ত মানুষ। নেটে এসে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না।
x আজ নেটে আসবে না ?
x ধ্যাৎ, আমি কিন্তু আর পাঁচ মিনিট পর চলে যাচ্ছি।
.
দিনার খান নেটে এসে শিরিনের ম্যাসেজগুলো দেখে কালবিলম্ব না করে লিখে, তুমি কেমন আছ ?
x  সরি বন্ধু গল্প নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।
x তুমি নেটে এসেছ, আমি খেয়ালই করি নি।
.
-এতক্ষণ পরে তোমার হুশ এলো ? ভাবছি আমি আমার একাউন্টটা ডিলেট করে দেব!
.
-আইডি ডিলেট কেন করবে ?
.
-পরে বলছি, আগে তোমার মতামত দাও।
.
-সমস্যার সৃষ্টি না হলে ডিলেট না করা ভাল। যদি ডিলেট করতেই হয় অন্য নামে আইডি খুলে আমাকে এ্যাড করে নাও। তা না করলে আমাকে তোমার মোবাইল নম্বরটা দাও।
x আমি তোমাকে কিছুতেই হারাতে চাই না।
.
-আমি নিজ থেকে হারিয়ে যেতে চাই।
.
-কেন বন্ধু ? আমার কী হবে ? কোথায় পাব তোমায় ?
x সমস্যা কী বল বন্ধু।
.
-আমি কাউকে ধোকা দিতে চাই না। এটাই সমস্যা ! অনেক তো হল এবার বিদায় নিতে চাই !
.
-প্লিজ বন্ধু, হারিয়ে গেলেও আমাকে সাথে রাখ। আমরা দু’জনে এ পৃথিবীর কোথায়ও লুকিয়ে থাকব নতুবা জগৎ থেকে এক সাথে চির বিদায় নেব।
.
-এটা তোমার আবেগ।
.
-আবেগ নয়, তুমি আমার সত্যিই একজন প্রিয় বন্ধু।
.
-যার শুরুটাই মিথ্যা দিয়ে, তার সাথে বন্ধুত্ব করাটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত ?
.
-তুমি মিথ্যের গন্ধ কোথায় পেলে ?
.
-আমি আমার কথা বলেছি। আমার শুরুটা মিথ্যা দিয়ে।
.
-খুলে বল প্লিজ !
.
-আমি ফেইক।
.
-এ পৃথিবীর সবাই বিশ্বাস করলেও অন্তত আমি করি না।
.
-সত্যিই বলছি আমি ফেইক।
.
-চ্যাট অপশনে অডিও বা ভিডিও কল দাও। কন্ঠ শুনে তাহলে বুঝতে পারবো।
.
-কিন্তু ক্যানো?
x কন্ঠ ছাড়া কি বিশ্বাস করা যায় না?
.
-কারন তুমি ফেইক না। ফেইক হতে পারো না। কিছুতেই না।
.
-এতোটা কনফিডেন্স ! আমার কন্ঠ শুনতে চাও ?
.
-হ্যাঁ। অন্য কোন পুরুষ ভাড়া করে কল দিবে না। অমুক দিন এই সময়ে তোমার সাথে আমার কী কথা হয়েছিল আমি কিন্তু এসব প্রশ্ন করবো। যদি সঠিক উত্তর দিতে পারো তাহলে আমি বিশ্বাস করবো। ছেলে সাজার সাহস থাকলে চ্যাটে  অথবা আমার নম্বরে কল দাও।
.
-তুমি শুধু সাংবাদিক নয়, সাংঘাতিকও। না বাপু তোমার এতো আবদার মেটানো আমার দ্বারা অসম্ভব।
.
-ঠিক আছে এটা না হয় কঠিন পরীক্ষা। সহজটা করে দেখাও। এ মুহূর্তে গেঞ্জী গায়ে ও টুপি মাথায় দিয়ে একটা পিক তুলে পাঠাও। তাহলে আমি কেটে পড়বো।
.
-বিজয় হলো আমার ।
.
-কীভাবে বিজয়ী হলে ? তুমি হেরে গেছো, আমি জিতেছি।
.
-না, আমার জয় হয়েছে, জয় হয়েছে আমার প্রতি তোমার কনফিডেন্সের। জয় হয়েছে আমার প্রতি তোমার অন্ধ বিশ্বাসের। এই নাও আমার আরো কয়টি দুর্লব ও সুন্দর ছবি।
.
-তাহলে এখন থেকে তুমি আমার চিরদিনের বন্ধু। এখন যে পাঁচটি ছবি পাঠিয়েছ খুবই অসাধারণ। মডেল কন্যা যেন।
.
-বেশি ওয়েলিং করা আমি পছন্দ করি না।
.
-এ মুহূর্তে আমার কাছে খুশি লাগছে, অবশেষে তুমি আমার হৃদয়ে ধরা পড়ে গেলে।
.
-কীভাবে ধরা খেলাম ? ধার নেওয়া অন্য লোকের ছবি অসাধারণ হলেই কী, আর না হলেই কী।
.
-আমি তোমার প্রতিটা ছবি মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে তুমি খুবই রক্ষণশীলা মেয়ে।
.
-আমি ছেলে, তাই  রক্ষনশীল ছেলে বলতে পার, রক্ষণশীলা মেয়ে নয়। বন্ধু বিদায় নিতে হচ্ছে। মোবাইলের চার্জ মাত্র ৭, যে কোন মুহূর্তে অফ হয়ে যাবে।
.
-তোমাকে এমনিতেই পাই না, আবার চার্জে লাগাও।
.
-চার্জে বসিয়ে আমি ফোন চালাই না।
.
-বন্ধু তোমার মোবাইল নম্বর টা দিচ্ছ না কেন ?
.
এসময় শিরিনের সবুজ আলো নিভে যায়। পর দিন রাত ১১টায় সে আবার নেটে আসে। দিনারকে জানান দেয়, আমি নেটে এসেছি তুমি আছ ?
.
-হ্যাঁ, তোমার অপেক্ষায় বসে ছিলাম।
.
-তুমি আসলেই একটা বোকা ছেলে।
.
-কেন গো ?
.
-আমি ফেইক বলার পরেও আমার জন্য অপেক্ষা করো, তাই তুমি বোকা !
.
-ফেইক বন্ধুটি আমার অতি প্রিয়। যাকে হারালে আমিও হারিয়ে যাব।
.
-একটা মানুষ এতো বোকা কীভাবে হয় ?
.
-মানুষ অদৃশ্য বস্তু বা ব্যক্তিকেও খুব ভালবাসতে পারে, যদি তার মনে প্রাণ থাকে, ভালবাসা থাকে।
.
-তাই বলে ছেলে হয়ে আরেক ছেলেকে ?
.
-তোমার মত ছেলে (?) কে আমার খুব পছন্দ। তাই……
.
-ধুর বোকার মতো কথা বলবে না!
.
-আমাকে তুমি বার বার বোকা বানিয়ে খুব মজা পাচ্ছ। তাই না ?
.
-আমি সত্যিটা বলছি।
.
-তুমি যাই বল না কেন, তোমার মত ছেলে এ পৃথিবীতে বিরল।
x কারণ, ছেলেদের পিরামিডগুলো সমতল। একমাত্র তুমি ব্যতিক্রম, যে ছেলের পিরামিডগুলো দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।
.
-আমার সত্যি কথা বলার সাহস আছে বলেই সত্যি কথাটা বললাম।
.
-ধরে নিলাম তুমি ছেলে। তাই বলে বন্ধু হতে বাঁধা থাকবে কেন? তাছাড়া আমার ঘ্রাণশক্তি খুবই প্রখর। আমি তোমার মাঝে নারীর গন্ধ পাচ্ছি।
.
-আচ্ছা,ফেইক আইডির লোকেরা তো টাকা চায়?
.
-অবশ্যই ওরা সুবিধা চায়।
.
-আমি এতদিন টাকা চাইনি বলে তুমি ধরে নিচ্ছ এটা ফেইক না। আমার জন্য এখন কিছু টাকা পাঠাতে পারবে ? আমি তোমার টাকার অপেক্ষায় থাকব।
.
-ফেইক কখনো নিজকে ফেইক বলে না। এ ধরনের আইডি কখনো ছেলে হিসেবেও দাবি করে না। এইটা আমার মাথায় আছে বিধায় তোমাকে আমি ফেইক ভাবছি না।
x তুমি ফেইক হয়েও যদি আমার কাছ থেকে টাকা চাও আমি দেব। তবুও আমি তোমাকে খুব ভালবাসি ও পছন্দ করি।
.
-টাকা পাঠাও।
.
-দেব। কত টাকা ? কীভাবে দেব ? বিকাশ নম্বর দাও।
.
-কত দিতে পারবে ?
.
-তোমার যেটুকু প্রয়োজন।
.
-দিতে পারবে না, আমার চাহিদা তোমার সাধ্যের বাহিরে।
.
-চাহিদা বড় হলে কাল পাঠাবো। ছোট হলে এখন দেব।
x আইডি ফেইক এটা প্রমান করার জন্যই বুঝি টাকা চেয়েছ ? তবুও আমার আস্থা আছে তোমার প্রতি।
.
-বাজে কথা বাদ দাও! আমার টাকা কীভাবে পাঠাবে তাই বলো?
.
-বললাম তো চাহিদা বড় হলে কাল পাঠাবো। ছোট হলে এখন দেব।
.
-এখন দাও। টাকার অঙ্ক ছোট করে চাইবো।
.
-বল কত পাঠাতে হবে ?
.
-তোমার মোবাইলে কত ব্যালেন্স আছে ?
.
-এ মুহূর্তে পাঁচ হাজারের একটু বেশি।
.
-টাকাটা এ মুহূর্তে আমার খুবই প্রয়োজন। তাই চাচ্ছি। পরশু দিয়ে দেব।
.
-কত দিতে হবে তাই বল।
.
-বেশি না, ২৪ পয়সা মাত্র।
.
-হা হা হা! চেয়েছিলে টাকা, এখন চাচ্ছ পয়সা।
.
-এবার তো প্রমান হলো আমি ফেইক। এবার কী আইডি ডিলেট করতে পারি ?
.
-এইটুকুন একটা মেয়ে, কী কঠিন ডিমান্ডই বা করবে তুমি। আমি দিতে রাজি যত চাও তুমি। তুমি আমার কাছে একটা তাজমহল!
x যদিও তাজমহলের একটা ইটের সমপরিমান টাকা আমার কাছে নেই।
x আমার একটা কিডনি বিক্রি করে হলেও তোমার ডিমান্ড আমি পূরণ করার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে আছি।
x যদিও আমার প্রাণের বন্ধুর চাহিদা পূরণের যোগ্যতা আমার নেই। তবুও চেষ্টা করে যাব বন্ধুর মুখে হাসি ফোটাতে।
x আরে ! হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে কেন বন্ধু ? একচেটিয়া সব আমিই বলে যাচ্ছি। কই তুমি
.
-তুমি ক্যানো বিশ্বাস করো না আমি ফেইক? আমি কি করলে তোমার বিশ্বাস হবে।
.
-ইমোতে কল দাও। আমার ইমো আইডি ০১৭১৬xxxxxx। তুমি ফেইক হলেও আমার বন্ধু।
.
-কল দিলে বিশ্বাস হবে?
.
-মোবাইল থেকে মোবাইলে দাও।
.
-তাহলে বিশ্বাস হবে ?
.
-হ্যাঁ।
.
-কাল দেব।
.
-কখন দেবে ?
.
-যখন সুযোগ হবে।
.
-মানে ছেলে বা ছেলের কন্ঠ যোগাড় করতে যখন পার তখনই কল দেবে। তাই না ?
.
-এভাবে বলছো ক্যানো ?
.
-কারন তুমি একটা ছেলেকে দিয়ে আমাকে কল দিয়ে আমাকে পুরো বোকা বানাতে চাচ্ছ।
.
-ওগো না!
.
-তাহলে এখন কল দাও। এখন রাত বারটা। এ মুহূর্তে তুমি ছেলে পাবে না, আমি জানি।
.
-এখন সম্ভব হবে না। কাল সকালে দেব।
.
-তোমার আরো কিছু ছবি পাঠাও ।
.
-ক্যানো ? অন্যের ছবি পাঠাতে ভালো লাগে না আমার।
.
-তুমি যদি ছেলে হও, তাহলে আমি মেয়ে।
.
-হাঃ হাঃ হাঃ ফালতু কথা বাদ দাও, আর টাকা পাঠাও।
.
-বার বার পিছনে ফিরে যাচ্ছ ক্যান। টাকার বিষয় শেষ হলো। কে ছেলে কে মেয়ে সেটাও  শেষ হলো। আজ আবার ছেলে সাজার চেষ্টা করে সময় ও এমবি অপচয় করছ ক্যান?
.
-ঠিক আছে । এমবি শেষ মনে হয়। বাই বাই, শুভ রাত্রি।
.
-এমবি পাঠাব ?
.
-তুমি কি মনে করো আমি ফেসবুক দিয়ে ভিক্ষা করি?
x আমি যদি সময় বের করে ফেসবুকে আসতে পারি তাহলে এমবি ভরতে বাহিরে যাবার সময় ক্যানো পাবো না?
.
-সরি বন্ধু, সরি
x কাল দুই দিনের জন্য হাতিয়া যাব। দোয়া করবে।
.
-হাতিয়া কি চাঁদের দেশে ?
x তুমি কি রাজ্য জয় করতে যাবে?
.
-আমার গ্রামের বাড়ি  হাতিয়ায়। সংবাদ সংগ্রহের কাজে যাব।
.
-আমার জন্য কী আনবে ?
.
-মধু !
.
-অন্য কিছু হবে ? কী আছে ওখানে ?
.
-রোহিঙ্গা আছে। একটা নিয়ে আসবো ?
.
-রোহিঙ্গা ? ওরা হাতিয়ায় কেন ?
.
-কক্সবাজারের ক্যাম্পে থাকা মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে হাতিয়ার ভাসানচর স্থানান্তরে প্রায় তিন হাজার কোটির অধিক  টাকা ব্যয় করে ভাসানচরে আশ্রয়ন প্রকল্প তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার।
.
-ওরা তো তোমাদের সমাজ ও পরিবেশ নষ্ট করবে।
.
-মোটেই না। ওরা ইচ্ছে করলে ওখান থেকে বের হতে পারবে না। ওটা তাদের জন্য বিশাল জেলখানা বলা যায়। ওদের পাহারায় সাতশ পুলিশ থাকবে, পাশাপাশি নৌ-বাহিনীও থাকছে।
.
-বাদ দাও রোহিঙ্গা। হাতিয়ায় কী পাওয়া যায় ?
.
– সমুদ্রের নানান জাতের তাজা মাছ, বিখ্যাত ইলিশ, বিভিন্ন মাছের শুটকী, বাদাম, খেজুরের রস,  গুড়, হরিণের শিং ইত্যাদি। নিঝুম দ্বীপের নাম শুনেছ ?
.
-কোন রাষ্ট্রের মধ্যে ওটা ?
.
-হাতিয়ার পাশে একটা দ্বীপ। পর্যটন এলাকা।
.
-হাতিয়া কোন রাষ্ট্রে ?
.
-নোয়াখালী রাষ্ট্রের একটি উপজেলা। কী আনতে হবে তা বল ?
.
-কিছুই আনতে হবে না, শুধু তোমাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনলেই চলবে। যে সুস্থ শরীর নিয়ে তুমি হাতিয়া যাচ্ছ ঠিক তেমন সুস্থতা নিয়ে ফিরে আসবে। শুধু এটাই চাই।
.
-ধন্যবাদ তোমাকে ।
.
-তোমাকেও ধন্যবাদ। কালকে কী কথা বলা যাবে?
.
-কেন যাবে না ? হাতিয়ায় ল্যাপটপ নেব না, মোবাইলে চ্যাট করা যাবে। তাছাড়া তোমার মোবাইল নম্বর আমার কাছে নেই, আমার নম্বর তোমার কাছে আছে। কল দিয়ে কথা বলিও।
.
-কল দিয়ে কথা বলার শখ আমার নেই। আমি যে ছেলে তা ধরা পড়ে যাব।
.
-মোবাইলে বর্ণমালা খুঁজে নিতে এবং বাটন টিপতে আমার কষ্ট হয়। তাই বলছিলাম কল দিয়ে কথা বলতে।
.
-আমাকে কখন সময় দেবে ?
.
-সারাদিন ব্যস্ত থাকবো, তাই রাত দশটার পর চ্যাটে আসবো।
.
-আমার চেয়ে তোমার ব্যস্ততাকেই যদি প্রাধান্য দাও তাহলে কথা বলার প্রয়োজন নেই।
.
-সরি ! তোমার প্রাধান্য আগে। চব্বিশ ঘন্টা ডাটা চালু থাকবে। তোমার যখনই ইচ্ছে হয় নক দেবে।
.
-নক করে তোমাকে না পেলে জবাই করে দেব।
.
-অবশ্যই পাবে।
.
-না পেলে খবর আছে কিন্তু। বাই বাই, ভাল থাইকো। সাবধানে চলাফেরা করবে। শুভরাত্রি।
.
-তোমাকেও শুভ রাত্রি।
.
দিনার খান  ও তার সহযাত্রী আরো দুই সাংবাদিক পরদিন সকালে হাতিয়ায় পৌঁছে সারাদিন সংবাদ সংগ্রহে বিভিন্ন ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সাথে দেখা করে রাতে হোটেলে ফিরে আসে। হোটেল সিঙ্গাপুরে তিন জনই পৃথক রুম ভাড়া নেয়। রাত সাড়ে দশটায় শিরিনের চ্যাটিং এর শব্দ শুনে মোবাইল খুলে ম্যাসেঞ্জারে যায় দিনার খান ।
.
-কেমন আছ জান?
.
-ভালই আছি। তুমি কেমন আছ ?
.
-ভালই আছি। সারাদিন ব্যস্ত ছিলে মনে হয়।
.
-ব্যস্ত ছিলাম। ডাটা চালু ছিল, নক কর নি ক্যান?
.
-এই যে তুমি ব্যস্ত থাকবে, তাই ডিস্টার্ব করি নি। কবে ফিরবে ?
.
-কাল বিকালে ফিরবো বলে আশা রাখি।
.
-আমিও সারাদিন একগাদা ফাইলে সই করার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এখন খুবই ক্লান্ত। শুয়ে যাব। কাল সকালে নক করবো।
.
-আরো আধা ঘন্টা সময় দাও।
.
-না, তুমি আমি দু’জনেই ক্লান্ত। শুয়ে পড়। শুভরাত্রি। বাই বাই
.
-ধন্যবাদ।
.
সকালে ঘুম থেকে উঠে হাতিয়া দ্বীপের স্বনামধন্য এক উকিলের বাসায় পূর্ব নির্ধারিত চিতই পিঠা ও হাসের মাংসের দাওয়াতে অংশ নেয় দিনার খানসহ তার সহযাত্রী অপর দুই সাংবাদিক। বাসায় আরো কয়জন মেহমান থাকায় বিশাল এক আড্ডা জমে। এ সময় শিরিনের চ্যাটিং এর কয়েকটি সাউন্ড আসতে  থাকায় দিনার খান  একটু বিব্রতবোধ করে মোবাইল সাউন্ড অফ করে দেয়। এক ঘন্টা পর হোটেলে ফিরে ম্যাসেঞ্জার ওপেন করে দেখে:
-কেমন আছ দিনার ?
x কথা বলছ না কেন ?
x আমি অপেক্ষা করতে পারবো না!
x আমি কার জন্য পথ চেয়ে রবো আমার কি দায় পড়েছে !!
x কিছু কি বলবে, না চলে যাবো?
x ঠিক আছে ব্যস্ত হয়ে থাকো। আমাকে নক করার দরকার নেই।
x বিদায়!
.
দিনার খান  শিরিনের চ্যাটগুলো পড়ে তার মনটা ভেঙ্গে পড়ে। কাজের ফাঁকে তাই সে শিরিনের সবুজ আলোর অপেক্ষায় বার বার ম্যাসেঞ্জার ওপেন করে শিরিনের উপস্থিতি না পেয়ে দুপুরে একটি ম্যাসেজ পাঠায়,
.
-ক্ষমা কর বন্ধু ওই সময় আমি এক বাসায় সকালের নাস্তার দাওয়াত খাচ্ছিলাম। তাই তোমার সাথে কথা বলতে পারি নি।
x বিকালে বাসায় ফিরে সন্ধ্যায় কথা বলবো। সন্ধ্যার পর আমি রাত দু’টো পর্যন্ত নেটে থাকব। ক্ষমা করে দিও বন্ধু।
.
সন্ধ্যায় দিনার খান  নেটে এসে শিরিনের অপেক্ষায় ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে থাকে। রাত বারটায় হঠাৎ নেটে শিরিনের আগমন। শুরুতেই সে তার মনের ক্ষোভ ঝাড়ে।
.
-তুমি আর কখনো আমার সাথে কথা বলবে না।
.
-সরি বন্ধু , আমি তো ক্ষমা চেয়েছি। নাস্তার দাওয়াতে ব্যস্ত ছিলাম।
.
-থাক তুমি নাস্তার দাওয়াত নিয়ে, আমি গেলাম।
.
-প্লিজ বন্ধু, আমার কথাগুলো শুন, তারপর না হয় চলে যেও।
-আমাকে কষ্ট দিয়ে সারাদিন টেনশনে রাখবে এমন বন্ধু আমি চাই না। এক্ষুনি আমি আমার আইডি ডিলেট করে দেব। তাছাড়া আমি ফেইক।
.
-ওকে, তুমি ফেইক। Even if you are fake, if you ask me for money, I will give it to you. Yet I love and like you very much. কথা না বলে চলে গেলে খুবই কষ্ট পাব।
.
-আমি টাকা চাইলেই টাকা দিতে হবে ক্যানো?? টাকায় কি তোমারে কামড়ায়!!
.
-তুমি ফেইক না এটা আমি শতভাগ নিশ্চিত, কারন আমি তোমাকে খুব খুব খুবই পছন্দ করি ও ভালবাসি। তোমার প্রতি আমার আস্থা ও ভালবাসা চিরকাল থাকবে অবিচল।
.
-তাহলে কান ধরো, আর কখনো আমাকে নেটে এনে চলে যাবে না। তাহলে চিন্তা করে দেখবো তোমার সাথে কথা বলা যায় কি-না !
.
-কান ধরে বলছি, আর কখনো তোমাকে নেটে ফেলে রেখে চলে যাব না।
.
-তুমি কান ধরেছ এটা আমি দেখি নাই। তবুও তোমাকে শাস্তি মেনে নিতে হবে।
.
-কেমন শাস্তি দিতে চাও ?
.
-আমি আমার আইডি ডিলেট করে রাখবো পনের দিন। এরপর আসতেও পারি, নাও আসতে পারি। হয়তো আইডি আর চালাব না। খোদা হাফেজ, বাই বাই।
.
দিনার খান  ম্যাসেজ লিখতে চেষ্টা করে। লিখার কোন অপশন পাচ্ছে না। সত্যিই মেয়েটা মনে হয় খুব জেদী। সুন্দরী মেয়েরা একটু জেদী হয়ে থাকে। তাই বলে পনের দিনের জন্য কেউ তার আইডি ডিলেট করতে পারে ! দিনার খান  তার অন্য আরেকটি আইডি থেকে শিরিনের আইডি চার্চ দিয়েও পায় নি। মেয়েটা তাহলে আইডি ডিলেট করে নেট দুনিয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ? হতাশ হয়ে পড়ে দিনার খান। উচ্চ পদে চাকুরীরত কোন নারী প্রতারক হতে পারে না, তবুও কেন সে নিজেকে ছেলে দাবি করছে, কেনই বা আবার নারীর ভূমিকা নিয়ে ভালবাসায় জড়িয়ে পরক্ষণে আবার বিদায় নিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে এসব দ্বিধাদ্বন্ধের কোন কূল পাচ্ছে না দিনার খান।
.
পরদিন দিনার খান  মাইজদীর একটি মানসিক ডাক্তারের চেম্বারে যায়। এখানে প্রতি বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে একজন প্রেমোলজিস্ট বিশেষজ্ঞ এসে প্রেম সংক্রান্ত  হতাশাগ্রস্থ, প্রেমে ব্যর্থ, জোড়া লাগানো, জুটি ভেঙ্গে দেওয়া এসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন। দিনার খান  তার এক বন্ধু থেকে প্রেমোলজিস্ট অধ্যাপক জাহিদ খানের সন্ধান পেয়ে ওখানে যায়। আট জনের সাক্ষাতের পর এক হাজার টাকা ভিজিট পরিশোধ করে সে জাহিদ খানকে সালাম দিয়ে তার সামনে গিয়ে বসে।
.
-নাম কী আপনার ?
.
-দিনার খান
.
-কী করেন আপনি :
.
-আমি সাংবাদিক।
.
-বুড়ো হয়ে গেলেন, এখনো বিয়ে করেন নি ?
.
-না স্যার এখনো বিয়ে করতে পারি নি। এ যাবত দশটি মেয়ের সাথে প্রেম করেছি। মগর একটারেও বিয়ে করতে পারি নি। সবাই আমার সাথে প্রতারণা করে ছয় মাস বা এক বছর পর ছেড়ে চলে যায়। এটা আমার এগারতম প্রেম। আমি এখন মহা হতাশায় ডুবে আছি।
.
-তো সমস্যা কী এখন ?
.
-ফেসবুক চ্যাটে একদিন একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয়। প্রথমে বন্ধুত্ব,পরে ভাললাগা, ভালবাসা ও এরপর প্রেম। ছয় মাস পার হলো আমি এখনও বুঝতে পারছি না মেয়েটি সত্যিই আমার প্রেমে পড়েছে কিনা এবং সেই মেয়েটি আসলেই মেয়ে কিনা ?
.
-কেন আপনি তাকে সন্দেহ করছেন ?
.
-আমি তাকে কয়েকবার ভিডিও বা অডিও চ্যাটে কল দিয়ে কথা বলতে ব্যর্থ হয়েছি। কল কেটে দিয়ে চ্যাটে এসে রেগে যায়, কেন কল দিয়েছি। মেয়েটির নাম শিরিন। সে সরকারী একটি প্রতিষ্ঠানে অফিসার পদে জব করে। যেমন ফর্সা তেমনি গড়নটাও সুন্দরী। বিশ্বাস অর্জনে আমি তার কাছ থেকে ছবি একটা চাইলে সে সাথে সাথে দশটা ছবি দিয়ে দেয়। এ যাবত একশরও উপরে ছবি পাঠিয়েছে। আমি যখন বলতাম, রাঙ্গামাটির স্বর্ণমন্দিরে যে থ্রিপিচটি পড়ে ছবি তুলেছিলে সে থ্রিপিচটি পড়ে বাম হাত দিয়ে ডান মুখ টেনে ধরে একটা পিক পাঠাও। দশ মিনিট পরেই সে ওভাবে পোজ দিয়ে ছবি পাঠিয়ে দিত। বিদেশ গিয়ে সেখান থেকেও আমার বলা নির্ধারিত পোজের ছবি পাঠিয়ে দিত। সে মাঝে মাঝে সরকারী সফরে বিদেশও যায়। আমরা ভালো একটা রিলেশনশীপে পৌঁছি। প্রেমটা এখনও গভীরে গড়ায় নি , একদিন সে আমাকে বলে,  আমি ক্ষমা প্রার্থী, আমার আইডিটা ফেইক। আমি ছেলে হয়ে আপনাকে চরকি ঘুরিয়েছি। আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। এখনো জব করি না।
.
-সে কী কখনো আপনার কাছ থেকে টাকা চেয়েছে ?
.
-না, চায় নি। তার ছেলে দাবি করাটা আমি বিশ্বাস করছি না বিধায় সে আমাকে বলেছে, ছেলেরা মেয়ে সেজে আইডি খুলে টাকা আদায়ের চেষ্টা করে। আমি এখনো চাইনি বলে তুমি আমার পিছনে লেগে আছ। এরপর সে একদিন আমার কাছ থেকে টাকা দাবি করে। আমি বললাম কত দিতে হবে এর জবাবে সে বলল মাত্র চব্বিশ পয়সা। প্রকৃতভাবে কখনো টাকা চায় নি। আমি দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সে রেগে যেত।
.
-আইডি ফেইক বলার পর আপনার সাথে আর কোন যোগাযোগ হয়েছে ?
.
-হচ্ছে। প্রতিদিনই হচ্ছে। তাকে আমি বার বার বলেছি, তুমি ফেইক না। আমার কাছে তুমি আসল লুকানোর চেষ্টা করছ। তাকে আমি বিনয়ের সাথে বললাম, ধরে নিয়েছি তুমি ছেলে, এখন থেকে তুমিও ধরে নাও আমি মেয়ে। ছেলে সেজে তোমার সাথে এতদিন প্রেম করেছি। ছেলে ও মেয়ে চরিত্র পরিবর্তন হয়েছে মাত্র, প্রেম ভালবাসার তো পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়। যেহেতু তুমি ছেলে আর আমি মেয়ে সেহেতু আমাদের প্রেমের যবনিকা টানা উচিৎ নয়। সে এটা শুনে কিছুটা অবাক হলো। কিন্তু হ্যাঁ বা না কোনো জবাব দিলো না। বার বার সে তার বিভিন্ন সেমিনার, সভা, ভ্রমনের ছবি পাঠায়। ছবি পাঠিয়ে পরক্ষণে নিজকে ছেলে দাবি করে সে আবারও ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেওয়ার চেষ্টা করে। নতুবা কয়দিন নিজেকে লুকিয়ে রেখে দশ পনের দিন পর আবার ফেসবুকে আসে। মাঝে মাঝে দেখি তার নামের মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে সবুজ সিগন্যাল জ্বলছে, আমি হাই হ্যালো লিখলেও কোন জবাব আসছে না, সিনও করছে না। আবার হঠাৎ হঠাৎ সে নিজেই আমাকে নক করে। দীর্ঘক্ষণ সময় দেয়। সে যদি ছেলেই হত এবং আমার সাথে কথা বলার ইচ্ছাই যদি না থাকত তাহলে সে আমাকে ব্লক মারতে পারে। কিন্তু তা না করে নিজ থেকেই একটার পর একটা বিভিন্ন পোজের ছবি পাঠিয়ে দেয়। আমার কাছে এখন তার শতাধিক ছবি সংরক্ষিত আছে।
.
-সেমিনারের ছবি ও তার ব্যক্তিগত পাঁচ ছয়টি ছবি দেখাতে পারবেন ?
.
-পারবো স্যার, এই দেখুন এ দু’টো সেমিনারের ছবি। আর এগুলো ব্যক্তিগত ছবি।
.
জাহিদ খান বার বার ছবিগুলো জুম করে পরখ করে বলেন, মেয়েটি বড় ধরনের অফিসার বলে মনে হচ্ছে। খুবই স্মার্ট ও সুন্দরী। বয়স পঁয়ত্রিশ বা ছত্রিশ এর কম না। দেখতে তরুনীই লাগছে। সেমিনারের একটি ছবির ব্যানারে প্রধান অতিথি হিসেবে শিরিন খানমের নাম। নামের নিচে পদবী পড়া না গেলেও বুঝা যাচ্ছে বড় ধরণের পদমর্যাদার মনে হয়। প্রধান চেয়ারেই বসা মঞ্চের একমাত্র মহিলা উনিই। উনি সিকিউরিটিজ এন্ড একচেঞ্জ কমিশনের বড় অফিসার হতে পারেন। এত উঁচু পর্যায়ের মহিলা কেন আপনার সাথে প্রেম করবে ? মাথায় ঢুকছে না। আচ্ছা আপনাদের চ্যাটগুলো দেখতে পারি ?
.
-দেখেন স্যার।
.
জাহিদ খান চ্যাটগুলো দ্রুত পড়ে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, তার আইডি ফেইক মনে হচ্ছে না। দুজন ছেলে মেয়ের ভালোবাসা তৈরি হয় ভালোলাগা থেকে, ভালো লাগা কমতে থাকলে ভালোবাসাও কমে যায়, যখন আর ভাললাগা কাজ করে না বিরক্তি এসে যায়, ভালোবাসায় তখন চিঁড় ধরে যায়। আপনি তাকে ভালোবাসছেন অতি আবেগ নিয়ে।, মনেপ্রাণে চাচ্ছেন, চাইতে পারেন। সেও কিন্ত আপনাকে ভালবাসে। তবে সে আপনার মত সরব নয়।  হয়তো সে টাইম পাসিং করছে। যখন দেখবেন সে আপনাকে পছন্দ করে না ভালো লাগে না। বুঝে নেবেন তার ভেতরে আপনার সম্পর্কে ভালোলাগা তৈরি করতে আপনি ব্যর্থ হয়েছেন অথবা এরই মাঝে তার হৃদয়ে অন্য কেউ সেই জায়গাটা তৈরি করে নিয়েছে। প্রেম আবেগের একটি বহিঃপ্রকাশ। প্রেমের সফলতা নির্ভর করে পারস্পরিক অন্তরঙ্গতা আর ভালোলাগার দায়বদ্ধতার ওপর। দেখুন, আপনাদের সম্পর্কটি অনেক দূর গড়িয়েছে, কিছুদিন চলার পর ভেঙ্গে গেল। সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলে সেটা ভেঙে যাওয়ার যাতনা অনেক  কষ্টের। আপনি হয়ত খুব কষ্ট পাচ্ছেন। ঝড়ের পর যেমন সব শান্ত হয়ে আসে তেমনি একদিন আপনার মনের ঝড়ও শান্ত হবে।
.
-না স্যার সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে একথা এখনো বলা ঠিক হবে না। সে আমার ওপর রাগ করে কয়েক বার আইডি ডিলেট করার ভয় দেখিয়ে আমাকে অনেক টা গুছিয়ে নিয়েছে।
.
-তা বুঝেছি। উঁচু পদবীধারী একজন অফিসার আপনার সাথে প্রেম কেন, কথা বলারও কথা নয়।
.
-এটাকে আমি সমস্যা মনে করছি না, ধনীর মেয়েও ফকিরকে বিয়ে করে।
.
-সেই ঘটনা টিন এজাররা ঘটায়, তাই বলে এ বয়সে না বা এমন উঁচু পদবীধারী কেউ করে না।
.
-আমি জানতে চাই একটাই, সেটা হলো আইডি ফেইক কিনা?
.
-আমি প্রথমেই বলেছি তো, আইডি ফেইক মনে হচ্ছে না। এখন  আপনার প্রয়োজন ধৈর্য ধরে নিজেকে স্থির রেখে সামনের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া। আপনার সাথে এতদিনের সম্পর্ক, আপনি তার কাছ থেকে মোবাইল নং এবং তার পদবী ও অফিসের নাম জানতে চান নি ?
.
– চেয়েছি। এসব প্রসঙ্গ এলেই উনি এড়িয়ে যান।
.
-আইডি ফেইক না। যিনি আপনার সাথে কথা বলছেন উনি শিরিন এতে আমার সন্দেহ নেই। সে হয়তো আপনাকে বার বার ধাক্কা দিয়ে ঝাঁলাই করে নিচ্ছে। জ্ঞানীরা এমন করতেই পারে। সে আবার আসবে, এতে এত হতাশ হওয়ার কিছুই নেই। যেদিন আপনাকে তার পরিচয় ও মোবাইল নম্বর দেবে সেদিন বুঝবেন সে সত্যি সত্যিই আপনার প্রেমে দেওয়ানা। এখন  আপনার প্রয়োজন ধৈর্য ধরে নিজেকে স্থির রেখে তার আবেগকে প্রধান্য দেওয়া। সে যেভাবে চাইবে আপনি তাতে দ্বিমত পোষণ করবেন না। তার সাথে আগ বাড়িয়ে কখনো ফালতু কথা বলবেন না। আর উনার ব্যক্তিগত বিষয়ে কোন প্রশ্ন করতে যাবেন না। আপনার প্রতি অতি দুর্বল যখন হবে তখন দেখবেন উনি নিজ থেকেই ব্যক্তিগত বিষয়গুলো শেয়ার করবে। আপনাদের ঘটনাটি খুবই ইন্টারেস্টিং। আমি পনের দিন পর আবার নোয়াখালী আসব। ফলোআপ জানাবেন। এজন্য আপনাকে কোন ফি দিতে হবে না। এখন যেতে পারেন। পনের দিন পর এসে পরবর্তী অগ্রগতি জানিয়ে যাবেন।
.
-আসবো স্যার, এখন গেলাম। আসসালামু আলাইকুম।
.
দিনার খান এই কয়দিন তার অন্য আইডি থেকে শিরিনের আইডি চার্চ দেয়। কোনভাবেই নেটে তার  কোন অস্থিত্ব খুঁজে পাচ্ছে না। পাখিটা তাহলে ফুঁড়ুৎ ! চার দিন পর হঠাৎ শিরিন নেটে এসে হাজির।
.
-কেমন আছ বন্ধু ?
.
-তুমি ভাল থাকতে দাও নি, তাই ভাল ছিলাম না।
.
-আমিও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় আসব না। চার দিন পার করতে কষ্ট হয়েছে। তুমি ফাঁকিবাজ হলেও তোমার প্রতি কেন যেন আমার মন বার বার ছুটে যাচ্ছে। তুমি খুবই সহজ সরল মনের ছেলে, আমিও কিন্তু ছেলে। তোমার আর আমার মধ্যে পার্থক্য হলো আমি মেয়ে সেজে  তোমার সাথে প্রতারণা করছি আর তুমি সেই প্রতারকের খপ্পড়ে পড়ে মরিচিকার পেছনে দৌঁড়াচ্ছ !
.
-প্রথম কথা হলো তুমি আমাকে ফাঁকিবাজ বলেছ। আমি এতে মাইন্ড করতে পারতাম। কিন্তু মাইন্ড করি নি। কারণ আমি তোমার ভালবাসার কাঙ্গাল। তুমি গালি দিলেও ভাল লাগবে। প্রিয় মানুষটির গালি খেতেও ভাল লাগে।
.
ওপাশ থেকে শিরিন  সদ্য ধারন করা আরো দশটি নতুন ছবি পাঠিয়ে বলে, ভাল করে দেখ তোমার ছেলে বন্ধুটা দেখতে কেমন !
.
-মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম । সত্যিই তুমি অপূর্ব, যেন লাখে এক জনই। ভারতীয় নায়িকা বললেও ভুল হবে।
x সত্যিই তুমি আমায় মুগ্ধ করেছ বন্ধু।
xসোশ্যাল মিডিয়ায় ধরা দিয়েছ তুমি
রেখেছি তোমায় হৃদয়ে ঢাকিয়া।
সাজিয়ে  তোমায় ঘরে তুলিব
লাল আলতা আর সুগদ্ধি মাখিয়া।
.
-বাহ! বাহ! আমাকে ঘরে তুলে তোমার লাভ হবে না, আমিতো ছেলে আমাকে সাজানোর ভিতর কী এমন আছে !
.
-তোমাকে সরাসরি দেখার সুযোগ হবে কিনা জানি না। তুমি ছেলে হলেও দেখার খুব ইচ্ছে জাগছে।
x ছেলেটা এমদম মেয়েলি, রূপবতী ও মনোমুগ্ধকর।
x আমার ফেসবুক ক্যারিয়ারে তুমিই সর্বসেরা।
xআমি মুগ্ধ হই তোমার আলেখ্যে, নীল বেদনা ক্রোধ নিয়ে জেগে থাকি সারাক্ষণ।
.
-বেশি পাম্প দিলে ফেটে যাব।
.
-সত্যিটাই বলেছি, পাম্প দিচ্ছি না। সব সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক হতে হয় না। কিছু সম্পর্ক মন থেকেও তৈরি হয় যা রক্তের সম্পর্কের চাইতেও আপন হয়। যাকে বলে আত্নার সম্পর্ক। সেই আত্নার সম্পর্কের একটি বন্ধু পেয়েছি তোমাকে।
.
-আমি তো ছেলে আগেই বলেছি।
.
-নিজকে আড়াল করলে কষ্ট পাই।
.
-বাস্তবতা সর্বদা কষ্টেরই হয়। আড়াল করবো ক্যানো? এটাই সত্য।
.
-জানি তুমি আমাকে কষ্ট দিয়ে নিজকে আড়ল করার চেষ্টা করছ। তবুও ভাল লাগে তোমার দেওয়া সেই কষ্ট।
.
-মিথ্যা ভালবাসা !
.
-কিছুই বলার নেই। তবু আমাকে তোমার হৃদয়ে থাকতে দাও।
.
-তোমার ভালো লাগবে, যখন তোমাকে কেউ সমকামী বলবে ?
x আমি যে ছেলে তুমি সেটা ক্যানো বুঝতে চেষ্টা করো না?
.
-বুঝবো তখনই যখন আমি তোমার মোবাইলে সরাসরি কথা বলবো।
.
-মাফ করো সম্ভব না। কিন্তু আমি ছেলে।
.
-কষ্ট পেলাম।
.
-কেন ?
.
-এই যে তুমি বার বার নিজেকে ছেলে দাবি করেই যাচ্ছ।
.
-তাহলে টাকা পাঠাও।
.
-দেব, তোমার বিকাশ নম্বর দাও।
.
-লাগবে না, তোমার টাকা আমি পেয়ে গিয়েছি।
.
-আমি তো এখনও দিই নি। তোমার জন্য সবই করতে রাজি, মরতে বললেও মরবো।
.
-ছি: ! এমন কথা বলছ কেন ?
.
-এটাই এখন আমার জন্য সত্য।
.
-তোমার দু’টো ছবি পাঠাও।
.
-আমার ভাল ছবি এখন হাতে নেই। পাঁচটা ছবি পাঠাচ্ছি, দেখলে হয়তো পছন্দ হবে না।
.
-যেগুলো আছে তা দাও, তুমি বিড়ি খাও ?
.
-না।
.
-কাল থেকে খাবে।
.
-কেন খাব ? মাথা ঘুরাবে, বমি হবে।
.
-আমি বলছি, তাই খাবে। খাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে ?
.
-ঠিক আছে কাল থেকে খাব। অভিজ্ঞতা কিছুটা ছিল। পাঁচ বছর আগে ছেড়ে দিয়েছি।
x ছবি পাঁচটা দিয়েছি।
.
-দেখেছি, এগুলো তো তোমার ফটো গ্যালারীতে দেওয়া ছিল। নতুন ছবি নেই ?
.
-না।
.
-ঠিক আছে, তোমার ফটোগ্যালারী আবার দেখে নিব। তোমার রক্তের গ্রুপ কী ?
.
-ও পজেটিভ। গ্রুপ জানার প্রয়োজন হলো কেন?
.
-ওকে, অনেক রাত হয়ে গেল। ঘুমাও তুমি।
.
-ঘুমাতে যাবে এখন ?
.
-তুমিই বল এখন কী করতে চাও।
.
-আমি তো চাই আরো কিছুক্ষণ কথা বলি, পারলে সারারাত ফেসবুকে থাকি।
.
-না থাক, ঘুমাব। সকালে অফিস আছে। কাল রাত নয়টায় সময় দেব। এখন ঘুমাও।
.
-আচ্ছা। ভাল থেকো। বাই বাই।
.
-ধন্যবাদ।
.
পরদিন পূর্বনির্ধারিত সময় রাত নয়টা শিরিন নেটে এসে দিনারকে না পেয়ে তার মাথায় ভীষণ জেদ চাপে। ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে রাগ ঝাড়ে :
-রাত ৯.০৫ মিনিট।
x -রাত ৯.১৫ মিনিট।
x-রাত ৯.৩০ মিনিট।
x আমি অপেক্ষা করতে পারবো না!
x আমি কার জন্য পথ চেয়ে রবো আমার কি দায় পড়েছে !!
x চলে যাচ্ছি, ১০টা৩০মিনিটে বেহায়ার মত আবার আসবো। কারন আমিও তোমাকে ভালবাসি।
.
রাত সাড়ে দশটায় দিনার খান ম্যাসেঞ্জারে শিরিনের ম্যাসেজগুলো পড়ে ভেবে পাচ্ছে না শিরিনকে কী বলে সান্তনা দেবে। কাজের চাপে প্রায়শ: তার রাত দশটার আগে বাসায় ফেরা হয় না। আজো তাই হলো। এ সময় শিরিনের চ্যাটিং প্রবেশ ।
.
-কী হলো, কোথায় ছিলে ? কথা দিয়ে কথা রাখতে পার না। কীসের সাংবাদকতা কর তুমি ?
.
-সরি বন্ধু, জরুরী একটা নিউজ নিয়ে মাইজদী শহরে খুবই ব্যস্ত ছিলাম।
.
-নিউজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলে, নাকি ধান্দায় ব্যস্ত ছিলে ? তুমি জান না আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছি।
x ফেসবুকে আমি মাসে একবার, বড়জোর দু’বার আসি ক্ষনিকের জন্য। তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার পর এখন প্রতিদিনই আসা লাগছে। এটা তোমার বুঝা উচিত নয় কি ?
.
-সরি বন্ধু সরি ? আর ভুল হবে না। তুমি কেমন আছ ?
.
-সরি বলে সব সময় পার পাওয়া যায় না।
x আমি ভাল নেই।
.
-কেন, কী হয়েছে তোমার ?
.
-নয়টায় আসার কথা ছিলো, আসোনি বলে ভালো নেই।
x ঠিক আছে ব্যস্ত হয়ে থাকো। আমাকে নক করার দরকার নেই।
.
-হাতজোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি।
.
-তোমার কথা মতো সব কিছু হবে???
x তুমি যখন বলবে তখন কথা হবে ! আমার সময়ের কি মূল্য নেই ?
x-আমাকে ভালবাসতে হলে তুমি তোমার সাংবাদিকতা ও গল্প লিখা ছাড়।
x-তুমি জান না, কবি, লেখক ও সাংবাদিকরা বউকে সংসারকে সময় দিতে পারে না, তাই ওদের বউরা টেকে না !
.
-অবশ্যই তোমার সময়ের মূল্য আছে। তুমি তোমার মূল্যবান সময় নষ্ট করে আমাকে সময় দিচ্ছ এতে আমি তোমার প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।
.
-কথা দিয়ে না রেখে কৃতজ্ঞতা দেখালে তা কী হয় ?
.
-এতবার সরি বল্লাম। বন্ধু আর লজ্জা দিও না প্লিজ ! এখন তো কথাই বলছি।
.
-বলছো, তবে সেটা তোমার বেঁধে দেওয়া সময়ে।
x একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে ?
.
-অবশ্যই দেব, বল তুমি।
.
-তুমি আমাকে তোমার অবসর টাইম পাস করার জন্য স্মরণ করো ?
.
-কখনই না। তুমি আমার আবেগ দেখে বুঝতে চেষ্টা কর।
.
-এটার মানে কী ?
.
-তুমি তা বন্ধু হিসেবে হোক আর প্রেমিক হিসেবে হোক, আমি তোমায় হৃদয় থেকে ভালবাসি।
x তুমি আমাকে যেভাবেই গ্রহন কর, সেটা তোমার ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিলাম।
.
-আমি তোমার সময়ে আর চলতে পারবো না। টাকা পাঠানোর কথা ছিলো।
x পাঠাওনি ক্যানো ?
.
-কখন, তুমি টাকা পাঠাতে না করলে না ?
.
-আমি তো বলছি তুমি আমাকে ভুলে যাও তাই বলে কি ভুলে যাবে?
.
-আমি জানি তুমি আমাকে খুব ভালবাস।
.
-না না, কখনই বাসি নি। মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি।
.
-না বাসলে অধিকার ফলাতে না। আমি জানি তুমি আমাকে খুব ভালোবাস।
.
– আমার তো খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তোমাকে ভালোবাসবো !
x তুমি আমাকে ভুলে যাও, না হয় কালকে টাকা পাঠাবে।
x আমি একা সবকিছু সাপার করবো – তার মানে নেই।
x তোমার কথা মতো সব হবে এটাও মানা যায় না।
.
-তুমি চাইলে সব কাজ ফেলে সারাদিন তোমাকে সময় দেব। বিকাশে টাকা কত পাঠাতে হবে ?
.
-তুমি কত দিতে চাও।
.
-যা চাইবে তা দেব।
.
-ঠিক আছে, দিতে হবে না। তোমার ভাবা উচিত ছিল আমার মাসে আয় কত ? আমি টাকা চাইব কেন ? তোমার মন পরীক্ষা করলাম মাত্র। আসলে তুমি বোকা !
x পাঁচটা ছবি পাঠালাম, এগুলো রাঙ্গামটিতে তোলা।
.
-দেখলাম তো। তুমি এখনো স্লীম। শরীরে একফোঁটাও মেদ নেই । দেখতে এখনো ষোড়শীর মত। বয়স কত এখন ?
.
-ছেলেদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই।
.
-তুমি বুকের উপর থেকে পিরামিড দুটো সরিয়ে নাও। তাহলে ছেলে সাজতে পারবে।
.
-দুষ্ট লোক তুমি।
.
-সাংবাদিকরা কখনো দুষ্ট হয় না, অনুসন্ধানী হয়।
.
-ক্লান্ত লাগছে। ঘুমাব এখন।
.
-কেন ক্লান্ত গো ?
.
-সারাদিন নিজেই ড্রাইভ করা লাগছে। ড্রাইভার ছুটিতে।
.
-কী ড্রাইভ করে ক্লান্ত হলে ?
.
-রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত হয়েছি।
.
-তুমি রিকশা চালাও ? রিকশাওয়ালী আমার খুব প্রিয় বন্ধু।
.
-সবকিছুতে হ্যাঁ হলে ঝগড়া করা যায় না।
.
-ঝগড়াটে লোকটিও আমার প্রিয়। তোমার প্রাইভেট কার আছে ?
.
-গরীবের আবার কার থাকে ?
.
-গরীবও আমার প্রিয়।
.
-তাহলে তোমার অপ্রিয় কী ?
.
-তুমি যা নও সেগুলোই আমার অপ্রিয়।
.
-তোমার হাতিয়া ট্রুরের একটা ছবিও দাও নি। ওই ছবিগুলো দাও।
.
-কাল দিতে পারবো। ছবিগুলো অন্যের ক্যামরায়। পারলে তোমার কিছু ছবি পাঠাও।
.
-ধ্যাৎ, অন্যের ছবি কয়টায় বা ধার করা যায় ? এখন নেই কাল ধার করে পাঠাব।
.
-তোমার আগের পাঠানে ছবিগুলো বড় করলে আরো সুন্দর ও আবেদনময়ী লাগে। ……দিতে ইচ্ছে করে। ভয়ে দিচ্ছি না। সত্যিই তুমি অনন্য ও অসাধারণ।
.
-কী দিতে ইচ্ছে করে ? শব্দটি হাইড করলে কেন? বল প্লিজ !
.
-বললে রাগ করবে তুমি।
.
-বল আমি রাগ করব না। বরং হাইড করা আমি পছন্দ করি না। নিশ্চয় সেটা তোমারও অপ্রিয়।
.
-চুমো দিতে ইচ্ছে করে । রাগ কর নি তো ?
.
-শুধু রাগ নয়, তোমাকে পুলিশ পাঠিয়ে এক্ষুণি ধরে এনে হৃদয় মন্দিরে বন্দী করতে ইচ্ছে করে।
x তুমি যে শব্দটি বলছো আমি যদি এগুলোর স্কিন শর্ট দিয়ে তোমাকে ব্লাক মেইল করি তখন কি করবে ? তাছাড়া নেটে এখন ব্লাক মেইল  হরহামেশাই হচ্ছে।
.
-তোমার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস রয়েছে বিধায় বলতে পেরেছি। ভালবাসার মানুষটির প্রতি যার অগাধ বিশ্বাস আর আস্থা থাকে সে পৌঁছে যাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। সততা, নিষ্ঠা আর বিনয় এ গুণগুলো যার মধ্যে থাকবে, সে অবশ্যই সফল হবে।
.
-চুমো দিয়ে বিনয় দেখাতে চাও ? আমাকে লিখছো ভালো । তবে অন্য কাউকে এভাবে বলবে না, কারণ আমার মতো অন্য সবাই না।
.
-আমি বলতে চাই নি, তুমি কৌশলে জেনে নিয়েছ।
.
-বলার বাকি থাকল কই ? শূণ্যস্থানে কী হবে এটা পাগলেও বুঝবে।
.
– একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে  আপন হওয়া যায় না। সন্দেহ থাকলে দুইজন একসাথে ঘুমাতেও পারে না। স্ত্রী তার রাগ ঝাড়তে স্বামীর গলায় ঘুমের মধ্যে ছুরি চালিয়ে দিতে পারে। স্বামীও পারে। বিশ্বাস ও আত্মার সম্পর্কটা একে অন্যের পরিপূরক।
x বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এ জগতের সব কর্মকান্ড।
x অঘটনও ঘটে না যে তা নয়।
.
-আমার কথায় ভয় পেয়েছ ? এ মুহূর্তে আমিও খারাপ হতে চাই।
.
-কেমন খারাপ হতে চাও ?
.
-ওয়ান মিনিট ওয়েট, একটার পর একটা এভাবে পাঁচটি গোলাপী ঠোঁটের কিস পাঠিয়ে দেয় শিরিন দিনারের ইনবক্সে। একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আগবাড়িয়ে এভাবে বলা ঠিক হয় নি। হোক না সে তার ভালবাসার মানুষ। তাছাড়া প্রেমোলজিস্ট জাহিদ খানেরও পরামর্শ ছিল আগ বাড়িয়ে শিরিনের মনের বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে। ইনবক্সে কিস পেয়ে দিনার খানের এবার কিছুটা ভয় কেটে যায় এবং সাহস পায়। কিস রিসিভ করে সে ধন্যবাদ জানিয়ে পাল্টা দশটা কিস পাঠায়।
.
শিরিন কিসগুলো সিন করে জবাব দেয়, ইসরে ! শখ কত ?
.
-মেয়ে হয়ে তুমি কিস পাঠাতে পারলে আমি ছেলে হয়ে বসে থাকলে সৌজন্যবোধটা হারিয়ে যাবে।
.
সবুজ আলো নিভিয়ে নেট থেকে চলে যায় শিরিন। দিনার খানের  আবারও টেনশন বেড়ে যায়। না বলে শিরিন মনে হয় মাইন্ড করে চলে গেল ! প্রায় আধা ঘন্টা অপেক্ষা করে শুয়ে পড়ে। শিরিনের কিস পেয়ে দিনার খান নতুন আরেক ভবিষ্যত পরিকল্পনার ভাবনায় ডুব দেয়। দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে তার ২৫ বছরের সংসার। অনন্ত এ সূখের সংসারের গোধূলি সন্ধ্যায় শিরিনকে সঙ্গী করা কতটুকুই বা যুক্তিসংগত হবে ! স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েরা কখনোই তাদের সংসারে দ্বিতীয় একজনকে মেনে নিতে পারবে না। যে কোন স্ত্রী তার স্বামীকে খুব ভালোবাসে। সে তার স্বামীকে হারাতে কখনো চাইবে না, যদি ওই সংসারে ভালবাসা বিরাজ করে। তার স্বামীকে আরেকজন নারীর সাথে ভাগাভাগি করতে হবে। তার ভালোবাসা, হাসি, রসিকতা এগুলো সে ছাড়াও আরেকজন নারী উপভোগ করবে ? তাকে ছাড়াও আরেকজন নারীকে স্পর্শ করবে, আর তাকে ভালোবাসার কথা শোনাবে ! অসম্ভব। এটা কোন স্ত্রীই মেনে নিতে পারবে না। দ্বিতীয় বিয়েতে চরম ক্ষোভ, দুঃখ, আর অপমানের জ্বালায় সে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এতসব  ভাবনার মাঝে একসময়  তার দু’চোখ বন্ধ হয়ে যায়। সকালে  একটু দেরীতেই ঘুম ভাঙ্গে তার। বিছানায় এখনো শুয়ে আছে। হঠাৎ মোবাইলে চ্যাটিং এর টোন কানে বাজলো তার। সে ঘড়ির দিকে তাকায়, সকাল এগারটা পার হয়েছে পাঁচ মিনিট আগে। শিরিনের এখন অফিস টাইম, এ অসময়ে চ্যাট করার কথা নয় ভেবে সে এখনো শুয়ে আছে। আবার পর পর তিনটি চ্যাটিং টোন এসে কড়া নাড়ে  দিনার খানের  মোবাইলে। সে এবার বিছানা ছেড়ে হাতের নাগাল থেকে মোবাইলটা টেনে নেয়। চ্যাট ওপেন করে সে খুশিতে যেন আত্মহারা।
.
-কেমন আছ তুমি ?
x ঘুম থেকে উঠনি এখনো ?
x ভেবে ছিলাম আজ যেহেতু অফিসে যাই নি, দু’তিন ঘন্টা চ্যাট করা যাবে। আর তুমি এখনও ঘুমিয়ে আছ।
x ঠিক আছে আমিও চলে যাচ্ছি।
.
-প্লিজ, যাবে না, আমি এসে গেলাম। তোমাকে ছেড়ে আমি কখনো যাই নি।
.
-কোথায় ছিলে এতক্ষণ ?
.
-চ্যাটিং সাউন্ড পেয়েই ঘুম থেকে এসে মোবাইল হাতে নিই। আরো পাঁচ মিনিট সময় দাও। আমি মোবাইল টিপে চ্যাটিং করতে খুবই ঝামেলাবোধ করছি। ল্যাপটপ ওপেন করে কথা বলবো।
.
-যাও, তিন মিনিট সময় দিলাম।
.
তিন মিনিট পর সে ল্যাপটপ ওপেন করে শিরিনকে বলে, তুমি তো এ সময়ে অফিসে থাকার কথা!
.
-ছুটি নিয়েছি, একদিকে আজ রেস্টে থাকবো অপরদিকে তোমাকেও সময় দিব বলে ভাবছি।
.
-তুমি আমার হৃদয়ের স্পন্দন, অথচ আমি এখনো তোমার হৃদয়ে পৌঁছাতে পারি নি। এটা আমার চরম ব্যর্থতা। তাই নয় কী?
.
-তোমার ঘরে যিনি আছেন উনি কী হৃদয়ের স্পন্দন নয় ?
.
-না, তুমিই আমার একমাত্র হৃদয়ের স্পন্দন।
.
-সেটা আবার কী ? বিয়ে করবে আমাকে ? ভেবে চিন্তে বলবে।
.
-করব যদি তুমি সন্মতি দাও। আর আমাকে তুমি ছুঁড়ে ফেলে দিলেও আমি তোমাকে ছাড়ছি না। এ জগতে একতরফাও ভালবাসা হয়।
x আজীবন তোমাকে দূর থেকে হলেও বন্ধু হিসেবে ভালবেসে যাব।
x বন্ধু অনেকে হতে পারে, হৃদয়ের বন্ধু একজনই হয়। সেটা তুমিই।
x ভেবেই বলেছি।
.
-ভীমরতি ধরেছে তোমার মগজে। তুমি স্বামী, নাকি বন্ধু হতে চাও।
.
-তোমার ইচ্ছে। যেভাবে ভাববে তুমি।
x জোর করে বা প্রতারণা করে আমি কিছুই হতে চাই না। সেটা তোমার ইচ্ছের উপর ছেড়ে দিলাম।
.
-কিন্তু আমিই তো প্রতারণা করছি তোমার সাথে।
.
-না। তুমি প্রতারক নও।
x তুমি জায়গা না দিলেও আমি তোমাকে একবারের জন্য হলেও ঢাকায় গিয়ে সরাসরি দেখে আসবো যেন আমার আত্মা শান্তি পায়।
.
-আমার চেয়ে বেশি চিনো আমাকে ? আমি যে এই ফেইক আইডি ব্যবহার করছি এটা কি প্রতারণা নয় ?
.
-তুমি আবার সেই পিছনের বিতর্কে চলে যাচ্ছ। তুমি ছেলে হলেও যে মেয়েটির দু’শর কাছাকাছি ছবি আমাকে ইনবক্সে দিয়েছ ওই মেয়েটিকেই আমি একবারের জন্য হলেও দেখে আসবো । কে ওই মেয়েটি ?
.
-তুমি সত্যকে বিশ্বাস করতে চাও না ক্যানো ? মেয়েটি কে আমিও জানি না ! ঢাকায় দেখতে এসে পাবলিকের মাইর খাও, এরপর পুলিশের হাতে – এটা কী চাও তুমি?
.
-ঠিক আছে মার খেতে চাই না। জোর করে কারো মন আদায় করা যায় না। তাহলে এখন থেকে আমি তোমার ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া ময়লা। বন্ধু আজ এখন থেকে বিদায় নিচ্ছি। গত কয়টি মাস ধরে আমাদের লুকোচুরি খেলার মাঝে ভুল করলে ক্ষমা করে দিও।
x-ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে তোমার ছেলে সাজার তত্ত্বের উদয় কেন হল বুঝতে পারছি না।, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফল কী। পৃথিবীতে কেউ কারও নয়,  বিদায় বন্ধু বিদায়।
.
-আমি তাহলে এতদিন তোমার গল্পের গিনিপিগ ছিলাম।এটাই সত্য। ইগো শুধু তোমার একার নও আমারও আছে… । তুমি ভালোই থাকবে…। মেয়েদের না শব্দটা বলার পিছনে আলাদা একটা কিক আছে সেটা তুমি বুঝছো না কেন ?
.
-তুমিও কেন বুঝতে চাচ্ছ না যে আমি তোমাকে পেয়ে যেন আলোর দিশা খুঁজে পেয়েছি । বার বার তুমি তোমাকে ছেলে  দাবি করে আমার সেই দিশাকে তুমি বরবাদ করে দিচ্ছ ?
x আমি তোমাকে গল্পের গিনিপিগ বানাতে চাই নি। আমার জীবন গল্পের নায়িকা বানাতে চেয়েছি
আমার জীবন গল্পটা যে এমনই হবে সেটা আমি বুঝতে পারি নি।
.
-আসলে তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি। ভালোবাসলে আমার ভিতরটা বুঝতে পারতে। তুমি শুধু বাহিরটাই দেখলে। যাই হোক ভালো থেকো।
.
-তুমি বার বার ছেলে সেজে আমার জীবন গল্পটা থামিয়ে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ অথচ তোমাকে নিয়ে আমি স্বপ্নের পাহাড় বুনেছিলাম। তুমি খুলে বললে আমি অবশ্যই বুঝতে পারতাম। বাইন মাছের মত এত আড়মোড় দিলে আমি তোমাকে মুষ্ঠিবদ্ধ করব কীভাবে ?
x যদি আমাদের দু’জনের মধ্য খানে বিশাল স্রোতশ্বিনী নদীও বয়ে যায়, সে নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করে কীভাবে দূরত্ব কমিয়ে আনা যায় অথবা আমাদের চলার পথে কোন কাঁটা থাকে সে কাঁটা দুজনের আলাপে সরিয়ে নিতে পারতাম।
x অবশ্যই আমি তোমাকে মন থেকেই ভালবাসি। এবং পরেও ভালবাসবো তুমি না চাইলেও। তবে সেটা তোমাকে না, ছবির ওই মেয়েটিকে।
.
-বাহ্ ! আমাকে নয়, ছবির ওই মেয়েটিকে !
.
-বার বার যখনিই আমি তোমাকে হৃদয়ে টানতে চেয়েছি তখনই তুমি ছেলে সেজে যাচ্ছ। আমাকে ছুঁড়ে ফেলতে চাচ্ছ এবং আমার হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়ার চেষ্টা করছো। তুমি বুঝতে চাচ্ছ না কেন আমি তোমাকে কত বেশি ভালবেসে ফেলেছি।
x আমি এখনো দৃঢ় বিশ্বাস করছি তুমি ছেলে নও। বেহেস্তের ৭০ হুরের একজন। খোদা তোমাকে পরকালেও বেহেস্তের হুর বানিয়ে জান্নাতে রাখবে। ভুলে হয়তো তুমি জান্নাত ছেড়ে দুনিয়ার চলে এসেছ। সত্যিই তুমি জান্নাতের ফুল। তাই তোমাকে ভালবেসেছি।
.
-এত পাম্প দেওয়ার প্রয়োজন কী ? তুমি তো কিছুক্ষণ আগে আমার কাছ থেকে বিদায়ও নিয়েছ। আসলে তুমি আমাকে কখনো ভালোবাসোনি।ভালোবাসলে আমার ভিতরটা তুমি বুঝতে পারতে, তুমি শুধু বাহিরটাই দেখলে।যাই হোক ভালো থেকো।
.
-তোমার ওপর রাগ করেই বিদায় নিতে চেয়েছিলাম। আমি তোমাকে কতটুকু ভালবাসি সেটা তুমি এখনো বুঝতে পার নি। বেশি ভালবাসতে গেলে অমনিই তুমি ছেলে সেজে পল্টি নাও।
x এ দুনিয়াতে হয়তো তোমাকে পাব না, পরকালেও আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকবো, আমার যদি বেহেস্তে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় সেখানেও আমি তোমাকেই চাইবো। যদি পেয়ে যাই তখন না হয় আমার আশা পূর্ণ হবে, সেই আশায় দিন গুনবো । আজ থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ফিরে এসে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রার্থনা করে যাব। একবারও যদি আমার প্রার্থনা কবুল হয় তাহলে তোমাকে এপারে না পেলেও ওপারে পাব বলে আমার বিশ্বাস।
.
-আমি বলেছিলাম না তোমাকে, আমার একাউন্ট ডিলিট করে দেব, এবার সত্যি ডিলেট করার সময় এসেছে। আমি এখন তোমার কাছে অপাংক্তেয়।
x-তোমার মত আমিও আজ থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ফিরে এসে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রার্থনা করে যাব যেন তোমার সাথে আমার কখনও দেখা না হয়। বিদায় নিলাম। ভুল করলে ক্ষমা করে দিও। বাই বাই
.
-অবশেষে সম্পর্কের ইতি টেনে চলে যেতে পারলে তুমি ?
-অবশেষে সম্পর্কের ইতি টেনে চলে যেতে পারলে তুমি ?
-অবশেষে সম্পর্কের ইতি টেনে চলে যেতে পারলে তুমি ?
.
দিনার খান এক ম্যাসেজ তিন বার পাঠিয়ে শিরিনের নেটে আসার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকে। এক সময় শিরিনের একাউন্টও নেট থেকে হারিয়ে যায়। দিনার খানের মনটাও খারাপ হয়ে যায় ! মাঝে মাঝে মাকড়সার জালে মনটা ছেয়ে ফেলে ! খেতে ইচ্ছে করে না, ঘুম তো দূরের কথা ! কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগে না! কারও হাসি দেখলে অসহ্য লাগে ! ভাবনাগুলো এক অজানা আবর্তের মধ্যে গুমরে গুমরে ঘুরতে থাকে ! শিরিনের প্রতি তার কখনও রাগ হয় না। ও এমনই। কথায় কথায় সে চটে যায়। আবার নিজ থেকেই নেটে হাজির হয়ে যায়। রাগ বা দুঃখ না পেলেও কিন্তু সব কেমন আবছা অন্ধকারের মধ্যে ডুবতে থাকে দিনার খানের তৃঞ্চার্থ হৃদয়! এবারও শিরিন পাঁচ দিন পর তার আইডি পুনরায় সচল করে দিনারকে নক করে।
.
-রাগ করে থাকতে পারলাম না। তোমার ওপর অভিমান করে কখনও নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারি নি। এখনও থাকতে পারলাম না। বড্ড অভিমান জেগেছিল। তাবিজ-তুমার আমি বিশ্বাস করি নি কখনও, কিন্তু আজ মনে হয়েছে তুমি আমাকে তাবিজ করে তোমার প্রতি পাগল বানিয়ে রেখেছ !
.
-আমাকে তুমি ভালবাস বিধায় তুমি রাগ করে থাকতে পার নি। তাবিজে আমিও বিশ্বাসী নই। আমিও তোমাকে প্রচন্ড ভালবাসি বলেই গত পাঁচ দিন নেটে খুঁজতে খুঁজতে আমিও হয়রান।
.
-আমি মেয়ে, আমাকে যদি সব খুলেই বলতে হয় তবে কিসের ভালোবাস আমাকে ! পল্টি নেওয়ার মাঝে আলাদা একটা মজা আছে, এটা তুমি বুঝছ না। প্রেমের মাঝে যদি বিরহ না থাকে সেটা আবার কেমন প্রেম !
.
-ও আচ্ছা। দুষ্ট কোথাগার। তুমি যে দুষ্টামী করতে পার আমি সেটা বিশ্বাস করতে পারি নি। একাউন্ট ডিলেট করেছিলে কেন, আমার সাথে কথা না বললেই তো হয়।
.
-তোমার সাথে কথা হবে না, তাহলে সেই একাউন্ট রেখে কী লাভ ? তাই ডিলেট করেছি।
.
-ওকে আর কখনও ডিলেট করবে না। আমি তোমার পাশে থাকব। একাউন্ট ডিলেট করলে আমি হতাশায় ডুবে যাব। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে।
.
-খুশি হলাম।
.
-অতীতে ভুল হলে ক্ষমা কর প্লিজ। অনুরোধ থাকবে আর কখনো তুমি ছেলে সাজবে না, প্লিজ। এতে আমার মন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। তুমি যতবার ছেলে সেজে ছিলে ততবারই আমি ভেঙ্গে পড়েছি।
.
-তোমাকে আমি বার বার ভেঙ্গে দিয়ে পরীক্ষা করে আমাদের প্রেম-ভালবাসার সম্পর্কের ভীত শক্ত করার চেষ্টা করেছি মাত্র। তুমি পথ ছেড়ে যাওনি, বরং আমার সব পরীক্ষায় তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ।
.
-তাই ! শুনে খুব ভাল লাগলো।
.
-আমি ছেলে হলে তুমি মেয়ে হবে সে রকমি তো কথা ছিলো !
.
-শোন, সব মান অভিমান ছাড়। আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। কাল ঢাকায় আসব। অনুমতি দেবে ? তোমার কথার বাইরে আমি এক কদমও যাব না। তুমি না করলে দেখতে চাইবো না।
.
-এছাড়া আর কোনো কাজ আছে ঢাকাতে ?
.
-নেই, শুধু তোমাকে একনজর দেখে চলে আসব।
.
-তাহলে করোনার মহামারির এই পরিস্থিতিতে আসার দরকার নেই। আমি উড়ে যাবো না।পরিস্থিতি ভালো হলে আমি নিজেই তোমাকে দেখতে যাবো। এই শীতে কোথায়ও না যাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। একান্ত দরকার না হলে ঘর থেকে বের হবে না। আমি তোমাকে হারাতে চাই না, যদিও আমি তোমাকে ভালোবাসি না।  তারপরেও তোমার ক্ষতি চাইবো না।
.
-আমি তোমাকে ভালবাসি না কথাটা বলে হাসালে আমাকে। তুমিই আমার জীবন। দুনিয়ার সব মায়া ত্যাগ করে আমি এখন তোমারই ।
.
-আমি তোমার জীবন হতে পারি কিন্তু তুমি আমার জীবন না। এগুলো আবেগ, আবেগ পরিহার করো, না হলে পস্তাবে।
.
-এটা আমার আবেগ নয়, বাস্তবতা। বিয়ের পর তোমাকে আমি কোন কাজই করতে দেব না।
.
-আমি নিজের কাজ নিজে করতে ভালোবাসি।
.
-আমিও আমার আদরের কাজ করতে ভালবাসি। আমি তোমার ও তোমার মনের সেবাদাস হতে চাই।
x বিনিময়ে কিছুই চাইবো না তোমার কাছ থেকে। অফিস টাইম ছাড়া বাকি সময় আমি তোমাকে কোলে নিয়ে থাকবো।
.
-এত আবেগ দেখানো ভাল না। আমাকে না পেলে তুমি তোমার পরিবারের সাথে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
.
-তুমি বললে সবাইর সঙ্গ ত্যাগ করে দেব।
x আমি যা বলছি তা শতভাগ সত্যি। কসম দিয়ে বলছি আমার প্রাণ থাকা পর্যন্ত আমার প্রাণটা তোমাকেই সঁপে দিলাম।
.
-ইস রে ! কত সুখ !
.
-এত দেওয়ানা হওয়ার কারন, তোমার রূপে, গুনে, যোগ্যতায় ও মন মানসিকতায় আমি মুগ্ধ।
.
-পাম দাও কেন আমাকে ?
.
-মনের অজান্তে তোমাকে আমি মনের মাঝে ঠাঁই দিয়েছি।
.
-এবার ছুড়ে ফেলে দাও মন থেকে!
.
-কেন ছুড়ে ফেলে দেব ?
.
-অজান্তে ঠাঁই দিয়েছ বলে।
.
-অজান্তে হয়েছে প্রথম দেখায়।
x এখন তো অজান্তে নয়। সব জেনে শুনে মনের গভীরে নিয়ে গেছি।
.
-তাই !
.
-ওখান থেকে আর বের করা যাবে না।
x বের করতে হলে আমাকে কেটে আগে আমার প্রাণ হরণ করে তোমাকে বের করতে হবে।
x তোমাকে হাত জোড় করে বলছি, একবার হলেও বল ‘’আই লাভ ইউ ’’।
.
-বলতে পারবো না।
.
-আমি তোমার ভালবাসার মানুষ এখনো হতে পারি নি, যতক্ষণ না তুমি নিজে মুখ ফুটিয়ে বলবে আমিও তোমাকে ভালবাসি।
.
-তুমি পাগল বলে তোমার সাথে কথা বলছি, তার মানে এটা নয়, আমি তোমাকে ভালোবাসি বলতে হবে।
.
-আমার তাহলে কিছুই বলার নেই। সবই তোমার ইচ্ছা। মন টা খারাপ হয় গেল।
.
-তুমি সত্যিই একটা গাধা। আমি ইমোশনাল হলেও বলতে পারব না,  ‘’তোমাকে ভালোবাসি’’। মেয়েরা কখনো আগবাড়িয়ে বলতে পারে না, বুঝে নিতে হয়। তুমি এখনও বলদই রয়ে গেলে। এত বলদরা প্রেম করে কীভাবে ! নাকি ইচ্ছে করেই বলদ সেজে আছ !
.
-জোর করে ভালবাসা আদায় করা ঠিক নয়। মন থেকে না এলে ভালবাসাও ঠিক নয়। ওই ভালবাসা স্থায়ীও হয় না।
.
-তুমি কী ফিডার খাও ?
.
-না, সরাসরি পাইলে ফিডার খাব কেন ? সরাসরি খেতে পছন্দ করি।
.
-হোয়াট ! মানে ?
.
-তুমি খাওয়াতে চাইলে অবশ্য খাব। তুমি কী দূর থেকে খাওয়াতে পারবে ? তাই সরাসরি বলছি। ঢাকায় গিয়ে সরাসরি ফিডার খাব।
.
-দুষ্ট ছেলে ! বেয়াদপি ঢাকতে পটু তুমি। একটা আবদার করবো,  রাখবে ?
.
-বল, অবশ্যই রাখব। তবে সেটা সাধ্যের মধ্যে হতে হবে।
.
-আগে কথা দাও রাখবে কিনা। তোমার সাধ্যের মধ্যেই আবদার করব।
.
-বল, আমি রাখব। তবে তুমি যদি বল শিরিনকে ত্যাগ করতে হবে সেটা আমি মানতে পারবো না। এটা ছাড়া আর যাই বল সব মানবো।
.
-তোমাকে দেখতে মেয়ের মত লাগছে । তুমি আজ থেকে গোঁফ রেখে দাও। এটাই আমার আবদার।
.
-অবশ্যই রাখবো। তুমি যা বলবে আমি তা পালন করব। তবুও আমি তোমাকে চাই।
x চুল ফেলে দিতে বললেও ফেলে দেব।
.
-ধন্যবাদ আমার লক্ষীসোনা।
.
-আমি ঢাকায় আসবো কিনা তা তো বল নি ?
.
– করোনায় মাঝে আসাটা ঠিক হবে না। তবে ভালভাবে প্রটেকশন নিয়ে আসতে পার। কখন আসবে ?
.
-কাল সকাল নয়টায় ঢাকা পৌঁছে যাব। হোটেলে ব্যাগ রেখে সোজা তোমার অফিসে চলে আসবো।
.
-হ্যাঁ, তাই কর। নিচ তলায় সিকিউরিটি গার্ড বেলালকে খুঁজে নেবে । আমি তাকে তোমার কথা বলে রাখবো। সে তোমাকে আমার রুমে নিয়ে আসবে। এখানে এসে অন্য কারো সাথে পরিচয় বা  কথা বলার প্রয়োজন নেই।
x দারোয়ান জানতে চাইলে বলবে উনি আমার আত্মীয় বা খালাতো বোন হয়।
.
-অফিসে তোমার পদবী কী?
.
-ওইসব তোমার এখন জানার প্রয়োজন নেই। বেলালকে দিনাজপুরের শিরিন ম্যাডাম বললে সে তোমাকে সাথে করে আমার রুমে পৌঁছে দেবে।
.
-আচ্ছা ওকে ! তাই করবো। তাহলে এখন আর চ্যাটিং করব না। কাল এলেই কথা হবে। বাই বাই।
.
-ঠিক আছে। শুভরাত্রি। ভালো থেকো,শুভ কামনা……।
.
দিনার খান ভোরে ঘুম থেকে উঠে লাল সবুজ পরিবহনে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। সকাল আটটার আগেই মতিঝিল পৌঁছে একটি হোটেলে উঠে। ফ্রেস হয়ে নাস্তা সেরে হোটেল রুমে এসে স্যুট পরে ও কড়া পারফিউম মেখে আগারগাঁওর উদ্দেশ্যে একটি সিএনজি ভাড়া নেয়। সোয়া নয়টায় শিরিনের অফিসের নিচে পৌঁছে। ওয়াশ রুমে ঢুকে এলোমেলো চুলগুলো হালকাভাবে আঁচড়িয়ে ওয়েট টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে বেলালাকে খুঁজে নেয়। বেলাল দিনারকে নিয়ে লিফটে উঠে পঞ্চম তলায় নিয়ে যায়। তাকে হাতের ইশারায় উপ-পরিচালক নেইম প্লেটটি দেখিয়ে বলে, ওটা ম্যাডামের কক্ষ, ওই রুমে উনি আছেন বলে সে আবার লিফট বেয়ে নিচে নেমে যায়। দিনার খান ধীরে ধীরে হেঁটে রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, দেওয়ালে সেঁটে থাকা নেইম প্লেটে শিরিন আক্তার, উপপরিচালক,  লেখা দেখে চমকে উঠে। সে ভীষণ ঘাবড়ে যায়, প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝে তার ভিতরের পোষাকগুলো ঘামে ভিজে যাচ্ছে যেন। ভাবছে – ”এতদিন না জেনেই আমি তাহলে জাত সাপের লেজ ধরে খেলা করেছি। আমার মত ক্ষুদে একজন সাংবাদিক ও শব্দ শ্রমিক এ মহিলার ধারে-কাছে যাওয়ারও যোগ্যতা  নেই, অথচ আমার সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এ মহিলার পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে।”  ভয়ে তার শরীর কেঁপে  উঠে। ভিতরে ঢুকবে, না চলে যাবে এ ভাবনায় দুলছে দিনার। রুমের সামনে প্রায় পনের মিনিট ধরে পায়চারী করছে । কিন্তু সাহস পাচ্ছে না রুমের ভেতরে যাবে কিনা। এদিকে সিসি ক্যামরায় ধারনকৃত চলমান ছায়াচিত্র সারক্ষণ সামনে থাকা এলইডি মনিটরে  ভাসছে। মনিটরের দিকে হঠাৎ চোখ যায় শিরিনের। পায়চারী করা দিনারকে দেখে চিনে ফেলে সে। চেয়ার ছেড়ে উঠে শিরিন রুমের বাহিরে এসে দিনারকে পিছন থেকে নাম ধরে ডাক দেয়, ‘’এই দিনু তুমি কখন এলে, ভেতরে আসছ না ক্যান’’ ? দিনার শিরিনকে দেখে চমকে যায় এবং কখন এলে, ভেতরে আসছ না ক্যান এর জবাব যেন তার কন্ঠস্বরে আটকে যায়। শিরিনের সামনে গিয়ে, আপনিই সেই শিরিন ?
.
-আগে ভেতরে এসো তারপর কথা বলব।
.
দিনার খান শিরিনের সামনের চেয়ারে মুখোমুখি হয়ে বসে।
.
-হ্যাঁ আমিই তোমার সেই কাংখিত শিরিন। বিশ্বাস হয়নি এখনো ? বিশ্বাস না হলে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা পিকচার বোর্ড দেখ। তোমার কাছে পাঠানো অনেকগুলো সেমিনারের ছবি ওখানে প্রদর্শিত রয়েছে, মিলিয়ে দেখতে পার।
.
-বিশ্বাস না হওয়ার কোন কারন নেই। আপনাকে প্রথম দেখায় চ্যাটিং করা শিরিনের সাথে আপনার ছবির মিল খুঁজে পেয়েছি বটে তবে …
.
-আমাকে তুমি আপনি করে বলছ কেন ? তুমি করে কথা বল। তবে কী এরপরের অংশ বল।
.
-তবে সেই শিরিনের সাথে এ মুহূর্তে আমার সামন বসে থাকা শিরিনের মাঝে কোথায়ও যেন বিশাল পার্থক্য রয়েছে। আমার এতদিনের ধারণাটা বদলে গেছে। তাই তুমি বলতে সাহস হারিয়ে ফেলেছি। ভেবেছিলাম তুমি ভাল একটা জব কর, কিন্তু এমন একটা উঁচু পদে আছ তা কখনো চিন্তা করি নি।
.
-দেখ দিনু, আমি যদি তোমাকে প্রথমেই আমার পদবীর পরিচয় দিয়ে দিতাম, তখন তুমি আমার পরিচয় জেনে আমার কাছাকাছি হতে সাহস হারিয়ে ফেলতে। ঠিক বলি নি ?
.
-অবশ্যই । আইসিটি আইনে অভিযোগ দিয়ে আমাকে চার দেওয়ালে আটকে রাখার ভয়ে আমি তোমাকে কখনো বন্ধু হয়ে পরে ভালবাসার জালে আটকাতে সাহস পেতাম না। চেষ্টাও করতাম না।
.
-এখন তো জেনেছ, সাহস হারিয়ে ফেলেছ, নাকি আছে ?
.
-দরজার সামনে নেম প্লেট দেখে আমি তখনই সাহস হারিয়ে ফেলেছি। তুমি না ডাকলে হয়তো আমি ওখান থেকেই ফিরে যেতাম।
.
-তাই ! তুমি যে এত ভিতু তা আমার জানার কথা নয়, সাংবাদিক হয়ে এত ভিতু হলে চলে ? ভাগ্যিস তোমাকে আমার আসল পরিচয় দিই নি।
.
-পরিচয় জানতে পারলে আমি তোমাকে হাই,হ্যালো বলারও চেষ্টা করতাম না।
.
-এখন তো জানলে, দৌঁড়ে পালাবে ?
.
-তুমি সাহস দিলে পালাবো কেন ? বাকিটা তোমার ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
.
-সাহস সঞ্চয় কর, প্রেম ভালবাসা কখনো যোগ্য অযোগ্যের মাপকাঠিতে হয় না। এটা সম্পূর্ণ মন মানসিকতার ওপর নির্ভর। তোমাকে আমি কখনও অযোগ্য ভাবি নি। তোমার বড় পরিচয় তুমি একজন সাংবাদিক, একটা পত্রিকার প্রকাশক ও লেখক। তুমি আমার চেয়ে অনেক সন্মানিত । নিমাই ভট্টাচার্যের উপন্যাস মেম সাহেব পড় নি ? কলকাতা শহরের লাখ লাখ বেকারের মাঝে কী করে একজন হাফ বেকার, হাফ রিপোর্টার শুধু তার প্রেমিকা মেম সাহেবের অনুপ্রেরণা ও  ভালোবাসার শক্তিকে অবলম্বন করে প্রেমিক সাংবাদিক বাচ্চু দিন দিন নিজেকে গড়ে নিয়ে কলকাতা শহরে আলোর মশাল জ্বালিয়ে ছিলেন তারই গল্প মেম সাহেব।
.
-গল্পটি আমি ছোট বেলায় পড়েছি। মেম সাহেব অর্থাৎ দৌলা বৌদি তখন সদ্য কলেজ শিক্ষক ও রিপোর্টার বাচ্চু দু’জনই তখন প্রেম করার বয়সী ছিলেন। সেটা তাদের যৌবনের প্রেমের গল্প ছিল। এ বয়সে সবার জীবনে প্রেম আসে। কোনটা সফলতা পায়, আবার কোনটা সফলতার মুখ দেখে না। আমরা তো এখন সে পর্যায়ে নেই। আমার বয়স এখন গোধূলি লগ্নে, তুমিও তার কিছুটা কাছাকাছি, এ বয়সে এসব মানায় ?  তাছাড়া আমাদের বয়স ও যৌবন এখন ভাটার দিকে । এতসব জেনে শুনে তবুও আমাদের আবেগের প্রণোদনা জেঁকে বসেছে বুঝছিনা।
.
-প্রেমে পড়ার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়,  বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান কথাশিল্পী গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। তিনি বৃদ্ধ বয়সে এসে নতুন করে প্রেমে পড়েছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ৬৩ বছর। সেই যুগে বাঙালির গড় আয়ুর হিসাবে এই বয়সের একজন মানুষকে বৃদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই বয়সে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠল এক বিদেশি নারীর। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নামে আর্জেন্টাইন এক কবির বয়স তখন ৩৮। কবিতা লেখার সুবাদে সে সময়ে তাদের দু’জনের সঙ্গে পরিচয় ও সান্নিধ্য উভয়ের মনকে দুর্বল করে তুলেছিল। জগদ্বিখ্যাত স্প্যানিশ নামে এক চিত্রকর পাবলো পিকাসোও তার বয়সের তোয়াক্কা করেননি। তিনি ৬৪ বছর বয়সে ফ্রাঁসোয়া জিলো নামের ২১ বছর বয়সী এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েছেন। প্রেমে বয়স কোনো বাধা নয়। এ ধরণের আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে।
.
-আমাদের সমাজে এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে ব্যক্তির জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান বা আত্মীয়স্বজনের সামনে হেয় হতে হয়। নিন্দা ও বিদ্রূপের বাণে জর্জরিত হতে হয় ওই দম্পতিকে।
.
-মানুষের মনের একান্ত অনুভূতির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার ক্ষমতা কারো নেই। এই তুমি নাস্তা করেছ ?
.
-সকাল আটটায় বাস থেকে নেমে হোটেলে উঠে ফ্রেস হয়ে নাস্তা করে এখানে এসেছি।
.
তাহলে বিস্কুট আর চা খাও বলে ইন্টারকমে পাশের রুমে কেউ একজনকে বিস্কুট আর চা আনতে বলে শিরিন।
.
-আমার চা চিনি ছাড়া হবে। ডায়াবেটিক গতকাল খালি পেটে ১০.৮ ছিল।
.
-হায় আল্লাহ আমারও তো গত পাঁচ মাস থেকে । পরশুর টেস্টে খালী পেটে  ৭.৩ ধরা পড়েছে। ইন্টারকম হাতে নিয়ে, এই শুন চায়ের সাথে চিনি দেবে না। হ্যাঁ, দু’টোতেই চিনি হবে না।
.
অফিস সহায়ক নাদের চিনি ছাড়া বিস্কুট ও চা নিয়ে টেবিলে রাখে ।
.
-নাও চা-বিস্কুট নাও। চা খেয়ে আমরা বের হব।
.
-কোথায় যাবে ?
.
-অফিসে কথা বলা ঠিক না, নিরিবিলি কোথায়ও যাব।
.
-যে কোন পার্কে চল তাহলে।
.
-পার্কে যাওয়ার মত আমার সে  সুযোগ কী এখন আছে ! তাছাড়া আমার তো রেস্ট্রেকশন আছে, যেখানে সেখানে আড্ডা দিতে পরবো না। চল একটা চাইনিজ হোটেলে যাব। ওখানে কিছুক্ষণ আড্ডা দেব।
.
-ঠিক আছে উঠা যাক।
.
-লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে শিরিন বলে, যদি কিছু মনে না কর বেইলী রোডে আমার বাসায়ও যাওয়া যায়।
.
-ওখানে কেন ? বাসায় লোকজন আছে না ?
.
-বাসা একদম খালি। কেবল কাজের বুয়া আর আমি থাকি।
.
-কেন, তোমার সাহেব ও ছেলে-মেয়েরা ?
.
-ওরা কেউ নেই ? স্বামীর সাথে পাঁচ বছর আগে বিচ্ছেদ নিয়েছি, কোন সন্তানও আমার নেই।
.
-না, তবুও বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না। চাইনিজে যাওয়া যাক।
.
-ওকে চাইনিজে চল।
.
লিফটে নেমে ড্রাইভারকে বলে যায়,  আমি না আসা পর্যন্ত কোথায়ও যাবে না। আমি এক ঘন্টা পর ফিরে এসে বড় সাহেবের অফিসে যাব। গাড়িতে উঠে ওরা। শিরিন ড্রাইভিং সিটে দিনার তার বাম পাশের সিটে বসে।
.
-বিচ্ছেদ কেন হয়েছে  তোমাদের ?
.
-ওটা একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। না জানাই ভাল। ভেবেছিলাম আর বিয়ে করবো না। পরে ভাবলাম আমার শেষ বয়সে আমাকে, আমার টাকা-পয়সা ও সম্পদগুলো  দেখা-শুনা করবে কে ?
.
-তোমার আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই ?
.
-বাবার বংশের কেউ নেই, কেবল আমি ও আমার বোন ছাড়া। চাচাতো-জেঠ্যাতো সম্পর্কের অনেকেই আছে। ওদের সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই।
.
-তোমার বাবার বংশের কেউ নেই কেন ?
.
-তিন বছর আগে আমি চরম অসুস্থ হয়ে পড়ি। বাবা মামনি আমার ছোট দু’ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর থেকে ঢাকায় আসছিলেন। থাক, আর বলতে পারছি না। সে ঘটনাটা মনে পড়লে আমি কেমন যেন অস্থির হয়ে যাই। মাথাটা ঝিম ধরে যায়।
.
-ঠিক আছে, বলতে হবে না। আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি ?
.
শিরিন এদিক ওদিক তাকিয়ে, সরি ! হোটেল তো অতিক্রম করে  অনেক দূর চলে এসেছি।
.
তাই পুনরায় ইউটার্ণ  নিয়ে ওই হোটেলের সামনে গাড়ি পার্কিং করে দোতলায় আধো আলো আধো অন্ধকার বিশাল কক্ষের নিরিবিলি এক কর্ণারে গিয়ে বসে। পুরো কক্ষটি যেন পূর্ণ জোছনার শুভ্র উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে আছে। শিরিন এমনিতে সুন্দরী তার ওপর আলো আধারীতে তার চেহারায় যেন নুরের আলো জ্বলছে।
.
-কী খাবে বল ?
.
-হালকা কিছু খাব।
.
শিরিন ওয়েটারের এগিয়ে দেওয়া মেন্যু দেখে নেয়। আমাদের জন্য জিনজার গার্লিক চিকেন ও পরে হালকা চিনি দিয়ে দু’কাপ কফি নিয়ে এসো।
.
শিরিন দিনারকে বলে, আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে ?
.
-হবে না কেন ? তুমি নীল-সবুজ ঝর্ণার কন্যা, তোমার চেহারায় ছড়িয়ে আছে অপরূপা রূপের বন্যা, রেশমী কালো দু’টো চোখ , কমলা কোষী রাঙ্গা ঠোঁট, রূপ কথার এক ডানাকাটা পরী তাইতো তুমি অতি সুন্দরী। এমন একজন পরীকে পছন্দ না করে থাকতে পারি !
.
-এসব আবেগী কথা রাখ। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম প্রেম তো দূরের কথা আর কখনও বিয়েই করবো না।
.
-যে নারীর সংসার নেই, তার জীবনের কোন মূল্য থাকে না। এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলে ?
.
-নিজের প্রতি এবং পুরুষ জাতির ওপর কেমন যেন অশ্রদ্ধা এসে গেছে আমার।
.
ওয়েটার খানা এনে পরিবেশন করে চলে যায়।
.
-তাহলে এখন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলে কেন ?
.
-সেই সিদ্ধান্তে ছিলাম, তোমার সাথে ফেসবুকে পরিচয় হওয়ার পর ডিসেশনটা দোদুল্যমান হয়ে যায়। এক পা এগোলে দু’পা পিছিয়ে যেতাম। তোমাকে আমি মাঝে মধ্যে ফেইক আইডি দাবি করে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি বার বার। তুমি ছিলে নাছোড় বান্দা। আমি ছেলে এটা তোমাকে কিছুতেই বুঝাতে পারি নি। আটার মত লেগে ছিলে।
.
-তাই ! আমার কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তুমি ছেলে না।
.
-তাছাড়া মনের ভেতর আরও একটি ইচ্ছে সুপ্ত ছিল অনেক দিন থেকে। সেই সুপ্ত ইচ্ছেটা বললে তুমি হাসবে।
.
-হাসবো না, বল তুমি।
.
-রমনা বা সরোওয়ার্দী পার্কের পাশ দিয়ে গাড়ি দিয়ে যাওয়ার সময় যখন দেখি,  ছোট ছোট প্রেমিক প্রেমিকারা একে অন্যের  হাত শক্ত করে ধরে নানান স্বপ্ন বুনে যাচ্ছে, কিম্বা যখন রাস্তার ফুটপাত দিয়ে কলেজ পড়ুয়া প্রেমিক তার প্রেমিকার হাত ধরে হাটছে তখন আমার মনে ইচ্ছে জাগে,  ইশ যদি আমারো এইভাবে একজন ভালোবাসার মানুষ থাকতো ! কিন্তু মনে হলে কি হবে আমি যে এখন সে পর্যায়ে নেই। সঠিক সময়ে বিয়ে করলে হয়তো এদের মত সমবয়সী আমারও সন্তান থাকত। তাছাড়া আমি ভীষণ অভিমানী। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন নিজেকে দেখি, মনে হয় আর কয়েক বছর পর বার্ধক্য আসবে আমার, আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে যৌবন। কেমন যেন  বড় ভয় জাগে আমার, প্রজন্মহীন জীবনের অবসান ঘটিয়ে হয়তো আমাকে একদিন বিদায় নিতে হবে এ পৃথিবী থেকে।
.
-দেশে হাজার হাজার যোগ্য লোক থাকা সত্বেও কেন তুমি আমার মত অযোগ্য, অপদার্থ ও অস্তগামী বুড়ো  একজন শব্দ শ্রমিককে বেছে নিয়েছো ?
.
-তা জানি না ! নিজকে এত ছোট ভাবছো কেন ? শুন, আমার কলিগরা অনেক বার বিয়ের চেষ্টা করলেও আমি মত দিইনি। আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে কিন্তু আমি বিয়ে করছি না কেন? আমি কিন্তু কাউকে পাত্তা দেই নি, বরং ওদের মুখের উপর বলে দিয়েছি, “আমি শিক্ষিতা, সাবলম্বী, প্রাপ্তবয়স্কা, তাই আমার ভালোমন্দ বিচার করা বা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে । আমাকে নিয়ে না ভাবলেও চলে। আসলে আর কারো সাথে সংসার করার কথা মনেই আসেনি। এখন যেহেতু তোমার সাথে জড়িয়ে পড়েছি, আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
.
-তুমি সত্যিই আমাকে বিয়ে করবে ?
.
-তুমি এখনও বোকাই রয়ে গেলে ! বাদ দাও এসব, বিয়ের পর পরবর্তী যেসব ঝামেলাগুলো মোকাবেলা করতে হবে তা নিয়ে আলোচনা কর। খানা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেতে খেতে কথা বলি। ধর, তোমার পরিবার আমাকে কখনোই মেনে নেবে না, তখন ?
.
-আমি আর পরিবারে ফিরে যাব না। একদিন ওরা হয়তো ভাববে আমি হারিয়ে গিয়েছি অথবা কোন দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছি। কিছুদিন খোঁজাখুঁজি করে একসময় হতাশ হয়ে আর খুঁজবে না।
.
-হারিয়ে যাওয়া এত সহজ না।
.
-তাছাড়া ওরা মানলেই কি, না মানলেই বা কি ? কয়দিন হয়তো আইনী লড়াই হবে। এক সময় মেনে নিতে বাধ্য হবে।
.
-মানে ? আমি আসামী হলে আমার চাকুরী যাবে না ?
.
-বলছিলাম না, এক সময় মেনে নিতে বাধ্য হবে। এমন ঘটনা অহরহ হচ্ছে। আবার সমাধানও হচ্ছে। তোমার জন্য আমি দুনিয়ার সব ছেড়ে দেব। তুমি যেভাবে চাইবে আমি তা করবো।
.
-যে দীর্ঘদিনের পরিবারিক বাঁধন ছেড়ে দিতে পারে, এক সময় সে আমাকেও ছেড়ে দিতে একটু ভাববে না। যাও, পরিবারকে সময় দাও।
.
-তুমি বললে আমি আমার পরিবারকে ম্যানেজ করে নেব। প্রথমে কাউকে জানিয়ে এসব হয় না। হয়ে গেলে কেউ কাউকে না মেনে উপায়ও থাকে না। কয়দিন মান অভিমান থাকবে। পরে আবার ঘুরে দাঁড়াবে আগের মত, সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে । এভাবেই তো ১ম বিয়ে এরপর ২য় বিয়ে এরপর ৩য় ৪র্থ বিয়েও মেনে নেয় সবাই।
.
-তোমার তাহলে চারটা বিয়ে করার ইচ্ছে আছে ?
.
-উদাহরণ দিয়েছি মাত্র।
.
-ব্যাংক চেকে একশত টাকা মাত্র, আবার কেউ এক কোটি টাকা মাত্র লিখে। দু’টো চেকেই মাত্র লিখা হয়েছে। তাই বলে দু’টো চেকের গুরুত্ব কী সমান হলো ?
.
-না, সমান গুরুত্ব কেন হবে ?
.
-এখন যিনি তোমার ঘরে আছেন, উনি তোমার প্রথম স্ত্রী মাত্র। আর আমি তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী মাত্র এরপর যিনি আসবেন তিনি তৃতীয় স্ত্রী মাত্র, এভাবে আর কয়টা মাত্র লিখার ইচ্ছে আছে তোমার ?
.
-লজ্জা দিলে ! প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি ‘’আর না’’। বাকি সিদ্ধান্ত তোমার ওপর ছেড়ে দিলাম। তোমার ইচ্ছে হলে বিয়ে হবে, আর না হয় ‘না’।
.
তোমার সমাজ ও পারিপাশ্বিক পরিবেশ কীভাবে নিবে সেটা ভাবা প্রয়োজন।
.
-না মেনে উপায় থাকবে না। তাছাড়া তুমি উচুঁ মানের অফিসার। সহজে সবাই মেনে নেবে। নাক ছিটকানোর পথ নেই। বিয়ের আগে বললে কেউ রাজি হবে না, করে ফেললেই না মেনে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। ধর, তুমি বেকার। কালো, এক পা নেই এমন মেয়েকে বিয়ে করলে এটা হয়তো কেউ মেনে নেবে না। এটা আমিও মানব না। পরিবারের বোঝা হলে কেউ মানবে না। তুমি তো স্বনির্ভর, অন্ধকার ঘর আলোকিত করার মত অসাধারণ একটা নারী। বরং সবাই তোমার পরিচয় ও রূপবতী চেহারা দেখে খুশিই হবে।
.
-ধর আমার একটা পা বিয়ের পরে নষ্ট হয়ে গেলো বা চাকরিটা চলে গেলো তখন ?
.
-বিয়ে হয়ে গেলে মেনে নেয়ার পর তোমার চাকরী গেল, অঙ্গহানি হল তাতেও কিছু যাবে আসবে না।
.
-তখন তো তোমার পরিবারেরই বোঝা হয়ে থাকতে হবে আমাকে।
.
-নো টেনশন আমি তো আছি। তখনও আমি তোমাকে মাথায় তুলে রাখব। বিয়ের পর অনেক কিছুই ঘটে। ধর্ষনের শিকার হলে কেউ কী বৌ ফেলে পালিয়ে যায় ?
.
-কালকেই একটা পা কেটে ফেলে দেব। দোখবো  তারপর তোমার ভালোবাসা কেমন থাকে আমার প্রতি।
.
-যাক আমি তোমার সব মেনে নিতে রাজি। এক পা কাটলেও রাজি। কারন আমি তোমার পা নয়, তোমার হৃদয়কে ভালবেসে ফেলেছি। আমি তোমার হাত, পা, মাথা কিছুই চাই না, আমি চাই শুধু তোমার বুকের ভেতরটা, যে বুকের ভিতর লুকিয়ে আছে সুন্দর একটি হৃদয়।
.
-ঢং দেখাও ?
.
-ঢং নয়, সত্য কথাটা বলছি। তোমার প্রতি আমার সেই আত্মবিশ্বাস আছে বলেই বলছি। একমাত্র আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তির দ্বারা পৃথিবীর সব অসম্ভবকে সম্ভব করা সহজ ।
.
শিরিন তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে, আমি তাকে যতভাবেই পরীক্ষা করছি না কেন, তার শেষ গন্তব্য যত বড় পাহাড় এসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করুক তা অতিক্রম করে আমার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। ওর থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে না শিরিনের। ওকে জড়িয়ে ধরে গালের দু’পাশে চুমোর বন্যা ঢেলে দিয়ে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করছে শিরিনের।
.
-এই, তুমি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে কী ভাবছো ?
.
-তা বলবো কেন ?
.
শিরিন ভ্যানেটি ব্যাগের চেইন খুলে দিনারের হাতে একটি গিফট বক্স তুলে দিয়ে বলে,
-এটা রাখ। তুমি ঢাকায় আসবে জেনে গতকাল সন্ধ্যায় কিনেছিলাম।
.
-ধন্যবাদ। আমি যে তোমাকে ভালবাসার প্রতিদান স্বরূপ কিছুই দিতে পারি নি, লজ্জায় ফেললে আমাকে।
.
-তোমাকে কিছুই দিতে হবে না, শুধু হৃদয়টা দিলেই হবে।
.
-সেটা তো অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছি বলেই দিনার শিরিনের মাথা টেনে মুখটা কাছে এনে চুপিসারে একটি চুমো দিয়ে দেয়।
.
-ইস্ , ছাড় ছাড়। কেউ দেখে ফেলবে তো !
.
-দেখবে কেন ? চারদিক তাকিয়ে খুব সতর্কতার সাথে আদর দিয়েছি।
.
-এবার উঠা যাক, বড় সাহেবের অফিসে দুপুর একটায় জরুরী মিটিং আছে।
.
-ঠিক আছে উঠ তাহলে। তোমার কাছ থেকে তো পজেটিভ কোন আনসার পাই নি এখনো।
.
-পজেটিভ আনসার পাও নি মানে ?
.
-কবে কোথায় কীভাবে আমাদের বিয়ে হবে, এসব বিষয়ে কিছুই তো বললে না।
.
-তর সইছে না বুঝি ! এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে এখনো অপেক্ষায় থাকতে হবে। কথা হবে প্রতিদিন। তুমি কী আজ ঢাকায় অবস্থান করবে ?
.
-তুমি কাল সময় দিতে পারলে হয়তো থাকতে পারি।
.
– সময় দেওয়া বড়ই কঠিন । আমার হাতে অনেক কাজ। কাল থেকে তিন দিন খুব ঝামেলা থাকবে। ফেসবুকে এসে আগের মত কথা হবে।
.
-তোমার মোবাইল নম্বর টা দাও।
.
-নাও, 01726x x x x x x । তবে শর্ত থাকবে জরুরী ছাড়া প্রেম ভালবাসার কথা মোবাইলে কিছুতেই বলার চেষ্টা করবে না। মোবাইল চব্বিশ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে থাকে।
.
-ওকে,  বলব না। চল বের হই।
.
শিরিন আগ বাড়িয়ে এক হাজার নব্বই টাকা বিল পরিশোধ করে । নিচে নেমে শিরিনকে বিদায় দিয়ে একটি সিএনজি নিয়ে দিনার তার হোটেলে ফিরে যায়। গিফট বক্স খুলে দেখে ভেতরে একটি এন্ড্রয়েড মোবাইল, সাথে সাত হাজর তিনশ টাকার একটি ক্যাশ ম্যামো ও ওয়ারেন্টি কার্ড। সন্ধ্যায় সে মাইজদী বাসায় ফিরে চ্যাটিং বসে। ম্যাসেজ খুলে দেখে শিরিনের অনেকগুলো ম্যাসেজ।
.
-তুমি কী চলে গেলে ?
x কোথায় তুমি ?
x বাসায় পৌঁছলে ম্যাসেজ দেবে।
.
হ্যাঁ আমি চলে এসেছি। পথে কোন সমস্যা হয় নি। রাত আটটায় বাসায় পৌঁছেছি লিখে ম্যাসেজ সেন্ড করে দিনার। শিরিন এখনো চ্যাটে বসে নি। তার নামের ওপর সবুজ আলো দেখা যাচ্ছে না। রাত দশটায় হঠাৎ নেটে শিরিনের আগমন।
.
-কেমন আছ ?
.
-ভাল নেই।
.
-কী হয়েছে তোমার, জার্নিজনিত কোন সমস্যা ?
.
-কিছুই হয় নি। তোমাকে ছেড়ে চলে আসায় মনটা খুবই খারাপ। ইচ্ছে ছিল আরও দু’দিন সময় নিয়ে আড্ডা দেব।
.
-তাই ! সব ইচ্ছে তো পূরণ হয় না। আমাকে তোমার কেমন লেগেছে ?
.
-তা কী আর বলা যায় ! প্রাণটা যেন জুড়িয়ে গেল।
.
-এতদিনের সেই সন্দেহ দূর হলো তো ?
.
-আমি তো কখনো তোমাকে সন্দেহ করি নি। বরং তুমিই মাঝে মধ্যে ছেলে সেজে আমার মাঝে সন্দেহের বীজ বুনতে চেয়েছিলে। আমি কিন্তু বরাবরই দৃঢ় ছিলাম, টলাতে পার নি তুমি। আজ আমার সেই অন্ধ বিশ্বাসেরই জয় হলো।
.
দিনার শিরিনের উদ্দেশ্যে একটা কবিতা লিখে সেন্ড করে ?
জড়িয়েছি আমি তোমার মুগ্ধ রূপের মায়ায়
তুমিই কেবল জুড়িয়ে আছ হৃদয়ের ছায়ায়।
তোমার গোলাপী রূপের ভাঁজে হৃদয় হারায়
ত্রিভঙ্গ তরঙ্গ জলে আমায় ভিজিয়েছ মায়ায়।
রাতে কী দিনে বন্ধু-বান্ধবীদের তালিকায়
শুধু তোমায় খুঁজে বেড়ায় চ্যাটিং আঙ্গিনায়।
যখনই দেখি জ্বল জ্বল রূপে জ্বলছে সবুজ বাতি
হৃদয় ভরে অনুভব করি চরম এক অনুভূতি।
আমি টেনে নিতে চাই আমার হৃদয়ের ছায়ায়
ক্ষণিক সময় পর তুমি বলে দাও বাই বাই !
তখনি বুকটা যেন ভরে যায় চিন চিন ব্যথায়
সারাক্ষণ পাহারায় থাকি ব্যথিত মাথায়।
পলে পলে আমাকে তুমি যেভাবে বেঁধেছ মায়ায়
তোমাকেই ঠাঁই দিয়েছি হৃদয়ের গভীর সীমানায় ।
.
-বাহ্ কী চমৎকার আমার প্রতি তোমার ভালবাসা। এ ভালবাসা কখনো ফুরিয়ে যাবে না তো ?
.
-পৃথিবীর কোনো কিছুই যদি অবিনশ্বর হয়, সেটা একমাত্র তোমার আর আমার ভালবাসা।
.
-ধন্যবাদ তোমাকে। কাল আমাকে হঠাৎ খুলনায় যেতে হচ্ছে।
.
-কেন ? ওখানে আবার কী ?  ‘’ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি’’ শীর্ষক একটা সেমিনার আছে। দুপুরের পর রওয়ানা দেব।
.
-একা ?
.
-না, সাথে আমার কলিগ যাবে। কষ্ট হচ্ছে অফিসের গাড়ি নিতে পারব না, আমার গাড়ি নিয়ে নিজেই ড্রাইভ করে যেতে হবে। ড্রাইভার করোনায় আক্রান্ত। তাই তোমার সাথে কথা নাও হতে পারে।
.
-ঠিক আছে দোয়া করি যেন নিরাপদে ফিরতে পার।
.
-আমি বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যদি দাও….হ্যাঁ। এখন বিদায় নিচ্ছি, খোদা হাফেজ। বাই
.
-ওকে, বাই বাই।
.
পরদিন রাত এগার টায় শিরিন খুলনা পৌঁছে চ্যাটিং এ বসে দিনারকে জানায়.
-পৌঁছে গেছি। বড্ড ক্লান্ত, অনেক খানি পথ ড্রাইভ করলাম।
.
-খুব ভালো লাগলো নিরাপদে পৌঁছতে পেরেছ জেনে।
.
-ঠিক আছে। এখন ঘুমাব। সকাল নয়টায় সেমিনার আছে। ভোরে উঠতে হবে।
.
-কোন হোটেলে উঠেছ ?
.
-টাইগার গার্ডেন ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে। এটা ফোর স্টার হোটেল।
.
-ওখানে ফাইভ স্টার নেই ?
.
-জানি না। সেমিনার এই হোটেলে, তাই অফিস থেকে এখানেই রুম বুকিং করেছে।
.
-সেমিনারে তুমি কী প্রধান আলোচক ?
.
-না, আমি দর্শক হিসেবে থাকব।
.
-ধুর পাগলী !
.
-পাগলী বললে কামড় বসিয়ে দেব।
.
-কামড় দিলেও সমস্যা নেই। কারন আমি জানি তোমার কামড়ে দাঁতের দাগ বসবে না। পাগলা তোর পাগলী কই, খুলনায় খুলনায়। পাবি কী তুই পাগলীরে ? পাবো হয়তো অনেক সাধনায়।
.
-আমি কী সত্যিই পাগলী ?
.
-তুমি আমার জন্য পাগল, তাই পাগলী বললাম।
.
-তুমিও তো আমার জন্য পাগল।
.
-আসলে দুনিয়াটাই পাগলের মেলা।
.
-ওকে ঘুম চেপে আসছে, ঢাকায় ফিরে কথা বলব।
x তুমিও ঘুমাও। বাই
.
-শুভ রাত্রি, ভাল থেকো।
.
দুই দিন পর শিরিন খুলনা থেকে ঢাকায় ফিরে আসে। রাত দশটায় ম্যাসেঞ্জারে দিনারকে জানায়, আজ বিকেলে আমি ঢাকায় ফিরে এসেছি। সারাক্ষণ তোমায় স্মরণ করেছি। কাজে মন বসে নি, কল্পনার জায়গাটা যেন তুমি দখল করে রেখেছ।
.
-তোমার মাথায় আমি ভালবাসার পোকা এমন ভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছি, আশা করি আমার পোকারা তোমার মগজকে আরো বেশি ধোলাই করবে  যেন তুমি আমাকে ছাড়া বাঁচতে না পার।
.
-আমার কাছে সেই পোকা দমনের ঔষধও আছে। তুমি কী চাও আমি সেই পোকাগুলো মেরে ফেলি ?
.
-মারতে পারবে না তুমি, সেটা আমি জানি। এগুলো এত বিষাক্ত পোকা যদি তোমার ঔষধের এ্যাকশনে মাথা থেকে বের হয়েও যায়,  আসার সময় তোমার মগজের কয়েকটি তার কেটে দিয়ে বের হয়ে আসবে।
x আমার কাছে ফিরে এসে আমারও মগজের গুরুত্বপূর্ণ তার কেটে দিয়ে ওরা পালিয়ে যাবে। এতে হয়তো আমি রাস্তায় নামব, আর তুমি সক্ষমতা বলে পাবনায় চিকিৎসা নিয়ে ঘরে ফিরবে।
.
-আমাকে তোমার পোকাগুলো পাবনায় পাঠাতে পারবে না।
.
-তোমাকে আমি রাস্তায় নামাতে চাই না, কারন তুমি আমার মেম সাহেব।
.
-নিমাই ভট্টাচার্য তার গল্পে মেম সাহেব তিলে তিলে উৎসাহ, দিক নির্দশনা ও প্রেরণা দিয়ে তার প্রেমিক সাংবাদিককে  কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তা মেম সাহেব গল্পে সুন্দর করে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।
.
-আমিও চাই তুমি আমাকে প্রেরণা যুগিয়ে তোমার ইচ্ছে মত গড়ে নেবে।
.
-আমার দায় পড়ে নি, তোমাকে ইচ্ছে মত গড়ে নেবার।
.
– তরুনী প্রভাষক একটা মেয়ে (মেম সাহেব) যদি তার ভালবাসার মানুষটিকে অনুপ্রেরণা যোগাতে পারে এত বড় একটা পদে থাকার পরও তুমি কেন পারবে না  ?
.
-তুমি তো আমার ভালোবাসার মানুষ না।
.
-এমন করে বলছ কেন ? তোমাকে ছাড়া যে আমি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলব।
.
-ইস, শখ কত ? ভারসাম্য হারালেই ভালো, তবেই তোমাকে পাবনায় পাঠাবো।
.
-শুন শিরিন,, প্রকৃত প্রেমের নিশানা অনন্ত, যখন দুইয়ে মিলে এক হবে, দুই দেহে যখন একই আত্মা বাস করবে কেবল তখনই তা অনন্ত হয় এবং বেঁচে থাকে অনন্তকাল। আমার আত্মা তোমার হৃদয়ের মাঝে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে। অথচ তোমার আত্মা আমার আত্মাকে এখনও পাকা  জাম ঝাঁকানির মত অনবরত ঝাঁকিয়েই যাচ্ছে।
.
-বার বার ঝাঁকানিতে প্রেম ভালবাসা ভীত আরো মজবুত হয়। কোলে থাকা বেবিকে  ঝাঁকানো হয় কেন জান না ?
.
-কেন ঝাঁকা হয় ?
.
-এতে ওদের দেহ কাঠামো দিন দিন মজবুত হয়। শিশুরাও বেড়ে উঠে নড়াচড়ার মধ্য দিয়ে। এক সময় ওরা নিজে নিজে উপুড় হয়, এরপর একদিন সে উঠে দাঁড়ায়। আমাদের সম্পর্কটা এখনো ঝাঁকানির পর্যায়ে আছে। মনে রাইখো, ধপ করে জ্বলে উঠা প্রদীপ ধপ করেই নিভে যায়। আমি চাই না আমাদের সম্পর্কটা নরম হোক, আমি চাই শক্ত প্রেম।
.
-বুঝলাম। আমিও চাই আমাদের প্রেমের ভীত যেন মজবুত হয়। আজ থেকে তোমাকে আমি মেম সাহেব ডাকবো। কারন ওই মেম সাহেবের নায়কও ছিলেন সাংবাদিক। তবে মেম সাহেবের মত মিছিলে গুলি খেয়ে অথবা অন্য কোনভাবেই মরতে দেব না। কারন পরিণয়েই প্রেমের স্বার্থকতা।
.
-ঠিক আছে জনাব, আজকের জন্য বিদায় নিলাম। সকালে উঠতে হবে। বাই বাই।
.
-ওকে ভাল থেকো। শুভরাত্রী।
.
দিনার খান পনের দিন পর প্রেমোলজিস্ট জাহিদ খানের সাথে সাক্ষাৎ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। যাওয়া হয় নি। উনি প্রতি পনের দিন পর নোয়াখালীতে চেম্বার করেন। আজ ত্রিশতম দিন। তাই চেম্বারের নম্বরে ফোন দিয়ে কনফার্ম হয়ে নেন আজ বিকালে জাহিদ সাহেব আসবেন কিনা। উনি আসবেন জেনে দিনার সন্ধ্যায় উনার চেম্বারে যান। সিরিয়াল ম্যান তাকে দেখে বলেন, আপনি ভেতরে যান আপনার সিরিয়াল লাগবে না। সালাম ঠুকে সে জাহিদ খানের সামনে বসে।
.
-গত ডেইটে আপনি আসেন নি কেন ? আমি আপনার প্রতিক্ষায় ছিলাম। কতটুকু এগোলেন বলুন।
দিনার এক এক করে পুরো কাহিনী জাহিদ খানকে বলতে থাকলেন ?
.
-হায় আল্লাহ ! আপনি ইতোমধ্যে দেখাও করেছেন ! কী বুঝলেন ?
.
-মেয়েটা খুব সুন্দরী। দেখে বয়স অনুমান করা যায় না, মনে হয়েছে পঁচিশ বছরের যুবতী, বাস্তবে তার বয়স পঁয়ত্রিশের বেশি। বড় পদে আছেন, দিন রাত খুব ব্যস্ত থাকে । আমাকে ওই দিন প্রায় এক ঘন্টা সময় দিয়েছে।
.
-এর পরের গল্পটা বলুন। দেখা করার পর এখন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছেন।
.
দিনার এর পরে ঘটে যাওয়া কাহিনীগুলোও জানালেন।
.
-জেনে রাখুন, ছেলেদের মগজ অনেকটা ঘড়ির কাঁটার মতো, মেয়েরা ইচ্ছে করলেই ঘুরিয়ে পেছনে নিয়ে যেতে পারে আবার সামনের দিকেও এগিয়ে নিতে পারে। একজন মায়ের আঠার বছর সময় লাগে তার ছেলেকে যুবক-এ পরিণত করতে, কিন্তু সেই যুবককে গাধায় পরিণত করতে একজন যুবতীর লাগে মাত্র পাঁচ মিনিট !
.
-হ্যাঁ, সঠিক বলেছেন।
.
-প্রেম আবেগের একটি বহিঃপ্রকাশ, যেটা এখন আপনাদের দু’জনের মাঝে কাজ করছে। আবেগীয় আকর্ষণ থেকে প্রেম নিবেদন করা যেতেই পারে কিন্তু সেটা সফল প্রেম হবে কি না, তা নির্ভর করে পারস্পরিক অন্তরঙ্গতা আর ভালোলাগার দায়বদ্ধতার উপর। আপনি যদি তাকে সত্যিই পেতে চান তাহলে কালবিলম্ব না করে বিয়েটা দ্রুত সেরে নেন। বয়স্ক প্রেমের স্থায়িত্ব খুবই কম হয়ে থাকে।
.
-সে আমার কাছ থেকে বার বার সময় চাচ্ছে আমাদের প্রেম যেন আরো মজবুত হয়। কারন হিসেবে বলছে, যে বাতি ধপ করে জ্বলে উঠে সে বাতি মুহূর্তেই নিভে যায়।
.
-এ বৃদ্ধ বয়সের প্রেমের স্থায়িত্ব ধরে রাখা খুবই কঠিন। প্রেম হচ্ছে অ্যামিন, ইথাইল, ফিনাইলের জৈব রাসায়নিক নেশা। কারো প্রতি প্রেম আকর্ষণ অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে, মাথা থেকে এই রাসায়নিক ক্রিয়ায় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে রক্তে মিশে সারা শরীরে প্লাবিত হয়। আর তা থেকেই বিভিন্ন রকম প্রেম উপসর্গ দেখা দেয়। বয়স্কদের প্রেম কিছু সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে এই রসায়ন শরীরের ভেতরে একটা টলারেন্স তৈরী করে এবং তা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এর সাথে লড়ার মতো প্রেমের নেশা শরীর আর তৈরী করতে পারেনা। যার ফলে প্রেমানুভুতির তীব্রতাও হারাতে শুরু করে। টলারেন্স যত বাড়ে, তত কমে আসে প্রেম। কমতে কমতে শিথিল হয়ে যায় এই সম্পর্ক। প্রেম অভিলাসী মানুষেরা বিচলিত, বেদনাহত হয়ে পড়েন। তবুও জীবন্ত করে তুলতে পারেন না এই নিস্ক্রিয়তা, শিথিলতা। রাসায়নিক নেশা কমে যাওয়ার আগেই কালবিলম্ব না করে বিয়েটা দ্রুত সেরে নিতে বলছি।
.
-স্যার, আমার মগজে অ্যামিন, ইথাইল, ফিনাইলের পরিমাপ করার ব্যবস্থা কী এখানে করা যাবে ?
.
-এ পরীক্ষাগুলো কেবল ঢাকাতেই হয়। আপনাকে পরীক্ষা করাতে হবে না। আপনি দ্রুত বিয়ের আয়োজন করে নিন।
.
-আমিও তাই চাচ্ছি। কিন্তু সে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে বলেছে !
.
-অধিকাংশ প্রেম সম্পর্কের নির্ধারিত গন্তব্য হচ্ছে যৌন সুখ। প্রেম অনুভূতি দেহের বা যৌন সুখের মধ্যে তার গন্তব্য খুঁজে না পেলেও একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে এই সম্পর্কের জোয়ারে ভাটা পড়ে যায়। আপনারা এখন একে অন্যকে পেতে  যেভাবে দেওয়ানা হয়েছেন, সময় গড়িয়ে গেলে গন্তব্যে পৌছার আগে এক সময় যৌনতায় টান পড়বে। এতে যদি ব্যর্থ হন আপনি নিজকে সামলিয়ে নিতে পারবেন না।
.
-স্যার, আমার কাছে কেমন যেন মনে হচ্ছে, আমার মনের ভেতর সবসময় যেভাবে আশার প্রদীপ দাউ দাউ করে জ্বলছে , ওর কাছে সেটা নিভু নিভু করছে। নচেৎ সে কালক্ষেপন করছে কেন !
.
-ফুল গাছের চাষ করলে, মৌমাছির অভাব হয় না; আর ফুল ফোঁটাতেই যদি পারেন তাহলে মৌমাছিকে কাছে টানতে চেষ্টা করতে হয় না, সে মধুর খোঁজে ফুলের কাছেই আসবেই।
.
-স্যার, সেই ফুল যদি শুকিয়ে যায়?
.
-ফুল শুকিয়ে নিস্তেজ হতে কিছুটা সময়ও  লাগে। ওই শুকনো ফুলে মৌমাছি এসে বেশিক্ষণ থাকে না। এজন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৌমাছিকে মধু খাইয়ে দেওয়া। ঠিক আছে এখন যান। আর একটা অনুরোধ থাকবে, নিমন্ত্রণ যেন পাই।
.
– প্রেমের বিয়ে গোপনেই হয়, কাউকে নিমন্ত্রণ দেওয়ার সুযোগ হয় না।
.
-সেটা আমিও জানি, দুষ্টমি করলাম। খোদা হাফেজ।
.
-আসসালামু আলাইকুম।
.
কী করছো ? শিরিনের ম্যাসেজ।
.
-কী করছো মানে ? গত দশ দিন ধরে নেট দুনিয়ায় তোমাকে খুঁজে বেড়িয়েছি। কোথায় ছিলে তুমি ?
.
-সরি ! তোমাকে জানাতে ভুলে গেছি। আমার আইডি হ্যাক হয়েছে। অনেক চেষ্টায় বহু কষ্টে আজ উদ্ধার করেছি।
.
-তাই ? এখন তুমি কোথায় ? অফিসে ?
.
-না, কারওয়ান বাজারে, গাড়িতে আছি। বারডেম হাসপাতাল যাবো।
.
-কেন কী হয়েছে তোমার ?
.
-ডায়াবেটিস বেড়ে গিয়েছে মনে হয়। বাসায় মেপেছি, খালি পেটে রেজাল্ট ৮.৭ ।
.
-অনেক। নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করনি ক্যান। নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে এটা কোন রোগ নয়। বরং আরো বেশি বাঁচার স্বপ্ন দেখায়,  মেনে চলতে পারলে হায়াত বাড়ে।
.
-বাদ দাও, অন্য কথা বল।
.
-তোমার সমস্যা নিয়ে আমিই তো ভাববো , আমি ছাড়া তোমার আর কেউ কী আছে ?
.
-আমার সমস্যা নিয়ে ভাবতে চাও ?
.
-অবশ্যই, কারন তুমি এখন আমার।
.
-শুধু ভাববে ? সমাধান করবে না?
.
-অবশ্যই চেষ্টা করবো।
.
-ঠিক আছে আমি এখন একটা বিকাশ নম্বর দিচ্ছি চার হাজার টাকা পাঠাও। এটা ডাক্তার আর টেস্টের জন্য লাগবে।
.
-এ মুহূর্তে দুই হাজার টাকা পাঠাতে পারবো। নম্বর দাও।
.
-তাতে কি ডাক্তার দেখানো যাবে ?
.
-এমুহূর্তে বিকাশে মাত্র বাইশ শত দশ টাকা ব্যালেন্স আছে, তাই।
.
-তোমার বিকাশ নম্বর দাও।
.
-আমার বিকাশ নম্বর কেন ?
.
-টাকাটা যেন আবার ফেরৎ দিতে পারি।
.
-ফেরৎ দেওয়া লাগবে না। তোমার বিকাশ নম্বর দাও।
.
-০১৭৩৭x x x x x x, এটা পার্সোনাল।
.
-ওকে পাঠাচ্ছি। পাঁচ মিনিট ওয়েট কর।
.
পাঁচ মিনিট পর :
-আমার নম্বর থেকে পাঠিয়েছি, । পেয়েছ ?
.
-চেক করি নি। ওই মোবাইলটা বাসায় রেখে এসেছি। বাসায় রাতে ফিরব, তখন জানাতে পারব।
.
-কয়টা নম্বর ইউজ কর তুমি ?
.
-দু’টো, একটা অফিসিয়াল আরেকটা আনঅফিসিয়াল।
.
-তুমি কি সত্যি পাঠিয়েছো ?
.
-সত্যি সত্যি সত্যিই, পাঠিয়েছি।
.
-কিন্তু কেন ? তুমি কি পাগল ? আমি টাকা দিয়ে কী করবো ?
.
-তুমি আমার হৃদয়ের স্পন্দন, তাই।
.
-কাজটা মোটেও ঠিক কর নি।
.
-কেন ঠিক হয়নি ? কারন তুমি আমার হৃদয়ের স্পন্দন হলেও আমি তোমর স্পন্দন এখনো হতে পরি নি, এ জন্য ?
x আমি না হয় একতরফাই তোমাকে ভালবেসে যাবো।
.
-তোমার বোঝা উচিত ছিল আমি একজন চাকুরিজীবী । আমার এতো কম টাকার দরকার কখনো পড়বে না। তাছাড়া ২০০০ টাকা ধার !  এটা সত্যি হাস্যকর….।
.
-হাস্যকর নয়, এটা ভালবাসার উপহার মাত্র। উপহার কখনোই ছোট হতে পারে না, সেটা যদি একটা ৩ টাকার কলমও হয়।
.
-আমি তোমার সাথে ফান করেছি। আর তুমি আমাকে এখন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিলে।
.
-তোমার আসলে বুদ্ধির ঘাটতি আছে। বাই, পরে কথা হবে। আমি এখন মেডিকেলে ঢুকেছি।
.
-ধন্যবাদ। বাই।
.
দুপুরে আবার শিরিনের ম্যাসেজ, মেডিকেল থেকে বের হলাম। ভরা পেটে ৮.৯।
.
-একটু হিসাব নিকাশ করে খেলে এটা কোন ডায়াবেটিস এর মাত্রায় পড়ে না। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যাও। প্রতিদিন আধা ঘন্টা ব্যায়াম করবে।
.
-তা প্রতিদিনই করি। বাসায় স্থির রানিং মেশিন আছে।
.
আচ্ছা বাসায় যাও লিখে দিনার দু’টো কিস জিফ পাঠিয়ে দেয়।
.
-এই শুন, চুমো খেলে ডায়াবেটিস আরও বাড়বে! ডাক্তার বলেছে।
.
-বাড়বে না কমবে। চুমো ডায়াবেটিসের এক নম্বর ঔষধ।
.
-দুষ্ট প্রেমিক তুমি। এখন কিন্তু বাসায় যাব না।
.
-কেন ?
.
-আগে অফিসে যাব। অনেকগুলো ফাইল দেখতে হবে। বিকেলে আবার মালিবাগে বান্ধবীর বাসায় পার্টি আছে। বাসায় ফিরতে রাত হবে।
.
-তুমি কী নিজেই গাড়ী ড্রাইভ কর ? এখন চ্যাট করছো গাড়িতে বসেই ?
.
-নিজেই করি তবে আজ ড্রাইভার আছে। তাই চ্যাটে আসতে পেরেছি।
.
-আসবেই তো, আমাকে ছাড়া তোমার একদিনও চলবে না।
.
-কারন তুমি পরকীয়ার হোম মিনিস্টার ! আমি কারো সংসার ভেঙ্গে সতিন হতে চাই না।
.
-সেলিব্রেটিদের অনেকেই তো এমন ইতিহাস সৃষ্টি করে যাচ্ছে। যদিও আমি সেলিব্রেটি নই।
.
-হুম।
.
-ক্ষতি কী। শেষ সময়ে একটা চমক সৃষ্টি করতে চাই, যদিও কাজটি প্রশ্নবিদ্ধ !
.
-পরে কথা বলি, এখন অফিসে ঢুকবো !
.
-ওকে,  ভাল থেকো। বিদায়।
.
শিরিন সন্ধ্যায় অফিস থেকে তার বান্ধবী বকুলের নিমন্ত্রণে মালিবাগে ওর বাসায় যায়। বকুলের ছেলে বুলেটের দশম জন্মদিন। যাওয়ার আগে মার্কেট থেকে কয়েকটি রজনীগন্ধার স্টীক ও পায়জামা পাঞ্জাবী কিনে নেয়। কলিংবেল টিপতেই বকুল দরজা খুলে বরণ করে বলে,
-সবাই তো এসে গেছে । এখন কেবল তোমার অপেক্ষায়।
.
-দেরী হয়ে গেল, অফিসে প্রচুর কাজ ছিল।
.
বান্ধবী রিতা, মিনা, জলি, মনি, পারুল এরা এক এক করে শিরিনের সাথে কোলাকুলি সেরে কুশল বিনিময় করে সোফায় গিয়ে বসে কথায় মশগুল হয় । বকুল এসে বললো, ছোট্ট পরিসরে ছেলে বুড়ো মিলিয়ে প্রায় ২০ জনের আয়োজন। কেক ছাড়া জন্মদিন হয় না ! দোকানে (হটকেক) একটাই ছিল, শেষ কেক। আর একটু পরে গেলে হয়তো পেতাম না। না পেলে আমার অনুষ্ঠান পন্ড হতো ।
.
শিরিন: পাবি না কেন?
.
বকুল: অফিস থেকে ফিরতেই ৭টা পার হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া আজ শেখ রাসেলের জন্মদিন ছিল। তাই মার্কেটে কেকের আকাল পড়েছে।
.
রিতা: তোর তাহলে ভাগ্য ভাল। না পেলে অনুষ্ঠানটাই বরবাদ হতো !
.
বকুল: কেক কাটার মাঝে আলাদা আনন্দ। বুলেটের বন্ধুরা সবাই অনেকদিন ধরেই একসাথে বেড়ে উঠেছে। আজ ওরা সন্ধ্যা থেকে আড্ডা দিয়েই যাচ্ছিলো বুলেটের জন্মদিনের কেক কাটতে। আমি অফিসে বসে খবর পাচ্ছিলাম !
.
জলি: কেক না পেলে কোন সমস্যা হতো না, জন্মদিনের কেক আমিও বানাতে পারি।
.
বকুল: দেরী হয়ে যাচ্ছে , সবাই উঠ কেক কাটতে যাই।
.
ড্রয়িং রুমে কেক কাটার আয়োজন করা হয়েছে। কেক রাখা টেবিলের পিছনে পাঁচটি ও সামনে সতেরটি চেয়ার বসানো হয়েছে। বুলেট ও তার বন্ধুদের কয়েকজন কেক সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যরা সবাই সামনের দর্শক চেয়ারগুলোতে বসে যায়। বকুল দাঁড়িয়ে বললো, হে আমার অতিথিবৃন্ধ, আজ আমার আদুরে সোনামনি বুলেটের দশম জন্মদিন। টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দশটি বছর অতিক্রম করেছে। আজ বুলেটের জন্মদিনে আমি শিশুদের যে উচ্ছ্বাস দেখেছি, এটাতেই আমার আনন্দ। শিশুদের মুখে হাসি ফুটানোই আমার স্বার্থকতা। তোমরা সবাই আমার বুলেটের জন্য দোয়া করবে।
.
শিরিন দাঁড়িয়ে বললো,  বুলেটকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ! সে যেন তার মা-বাবার মতই ভালো মানুষ হতে পারে, এই দোয়া থাকলো।
.
রিতা বললো, বুলেটকে আমার ও আমার পরিবারের তরফ থেকে অনেক অনেক আদর, ভালোবাসা ও আশীর্বাদ।
.
মিনা বললো, খুব সুন্দর মানুষ হয়ে সে বড় হয়ে উঠুক। অনেক অনেক ভালো থাকুক বুলেট।
.
জলি বললো, বুলেট যেন বুলেটের মতই গর্জে উঠে এ দোয়া করছি।
.
মনি বললো, সব সময়ই আমাদের বুলেট যেন হাসিখুশিতে ভরপুর থাকে এই দোয়াই রইল।
.
পারুল বলে,, বুলেট যেন মা ও প্রয়াত বাবার মুখ উজ্জল করতে পারে এ দোয়া করছি।
.
বকুল বলে, আমার প্রিয় বান্ধবীরা পিতা হারা বুলেটের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমার মতো একজন অতি ক্ষুদ্র মানুষের এতিম ছেলের জীবনে যদিও জন্মদিনের তেমন কোন গুরুত্ব নেই তবুও আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শোকরিয়া। যাক, এবার কেক কাটা শুরু করি।
.
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ স্লোগানের মধ্য দিয়ে কেক কেটে সবার মুখে কেকের টুকরো তুলে দেয় বকুল। এবার সবার হাতে হাতে খিচুড়ির প্লেট তুলে দেওয়া হয়। খিচুড়ি, বেশ ঝর ঝরা, সবাই খেয়ে প্রশংসা করে। খাওয়া শেষে শিরিন তার বান্ধবীদের জরুরী কথা আছে বলে ডেকে নিয়ে একটি কক্ষে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
.
বকুল জানতে চায়, জরুরী এমন কী কথা রে ?
.
শিরিন বলে, সড়ক দুর্ঘটনায় মা, বাবা ও দুই ভাইকে হারানোর পর সৈকতের সাথে বিচ্ছেদ। এর কিছুদিন পর বোনেরও স্বামী মারা যায়। সবই যেন আমাদের পরিবারের জন্য বিশাল একটা অভিশাপ। পাঁচটি বছর কেটে গেল। আমি আমার যমজ বোনকে নিয়ে এখন পৃথিবীতে একা হয়ে পড়েছি। ভেবে ছিলাম আমি আর বিয়ে করবো না।
.
বকুল শিরিনের মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে বলে,  আসলেই অভিভাবক না থাকলে নারীর জীবন অন্ধকার। বিয়ের সিদ্ধান্ত না নিয়ে তুই ভুল করেছিস। তোর বোনটারও স্বামী মারা যাওয়ার এত বছর পার হলেও এখনো বিয়ে দিস নাই।
.
শিরিন বলে, আমার কথাটা শেষ করতে দে। আজ প্রায় ছয় মাস হলো, একজন বয়স্ক সাংবাদিকের সাথে ফেসবুকে আমার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে ভাললাগা এরপর প্রেম-ভালবাসায় গড়িয়েছে। পরে জানলাম সে কিন্তু বিবাহিত।
.
পারুল বললো, বয়স্করা বিবাহিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
.
শিরিন বলে, তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে। সে আমাকে বিয়ে করে তার পরিবার ছেড়ে আমার সাথে ঢাকায় থাকতে চায়। যে কোন বড় কঠিন বিষয় ত্যাগ করে সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। আমি তাকে যতটুকু ভালবেসেছি সে আমাকে তার চেয়ে বেশি ভালবাসে। আটার মত লেগেই আছে আমার পিছনে।
.
মনি বলে, বয়স কত হতে পারে ?
.
শিরিন বলে, সেটা আমি কখনো জানতে চাই নি। ছবিগুলো দেখে মনে হয়েছে পঁয়তাল্লিশ না হয় পঁঞ্চাশ এর মধ্যে হতে পারে। ফর্সা ও খুবই সুন্দর ফিগার ।
.
মনি বলে, বয়স কোন সমস্যা না। সমস্যা এখন তাঁর পরিবার। ওরা দ্বিতীয় বিয়ে কখনো মেনে নেবে না।
.
পারুল বলে, যেহেতু তাঁর পরিবার না মেনে নিলে সে ঢাকায় এসে তোর কাছে থাকতে চায় এটাও একটা ভাল প্রস্তাব। তাছাড়া তোর একটা উঁচু পর্যায়ের জব আছে । কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। তুই বেকার হয়ে যদি ওই পরিবারের বোঝা হয়ে থাকতি তাহলে ভাববার বিষয় ছিল। তোর এখন সব মিলিয়ে লাখের কাছাকাছি প্রতিমাসে আয়। সে এখন কতটুকু ভালবাসে বা বিয়ের পর তোকে কোন দৃষ্টিতে নেবে সেটা এখন ভাবনার বিষয়।
.
বকুল বলে, যেহেতু আমাদের শিরিন রূপে গুনে অনন্য, শিরিনকে পেয়ে দুলাভাইও হবে ধন্য। আমার দেখা আরো দুইটি পরিবার আছে পরকীয়ায় জড়িয়ে দ্বিতীয় বউ হয়ে সুখেই আছে তারা।
.
রিতা বলে, তোর যে পদবী, রূপ ও চেহারা তুই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলে এরচেয়ে অনেক ভাল পাত্র জোটানো কঠিন ছিল না।
.
শিরিন বলে, ভাল বা খারাপ পাত্র আমি কখনো চাই নি। বিয়েই করবো না, এরই মাঝে সাংবাদিকের প্রেমে জড়িয়ে গেলাম। তাও দ্বিতীয় বৌ হবো। আসলে প্রেম বড় আজব জিনিস, কখন কীভাবে কার সঙ্গে জুড়ে যায় বলা যায় না। তুমি ইচ্ছা করলে কারো সঙ্গে প্রেমে জড়াতে পারবে না, মনের মধ্যে কাউকে নিয়ে স্বপ্ন বুনতে পারবে না। এটা হঠাৎ করে হয়ে যায়। বন্ধুত্ব থেকে হোক আর না হোক। ওই ছেলেটির ভালবাসায় কোন খাদ নেই। তাকে আমার ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। একদিন চ্যাটিং এ আসতে না পারলে সে যেন পাগল হয়ে যায়। আমি এখন কী করবো তোরা বল।
.
বকুল বলে, তোর বয়সও এখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। সমস্যা হওয়ার কথা না। বিয়েটা করে নিতে পারিস। একজন নারী একা থাকা কোন জীবন হতে পারে না।
.
শিরিন বললো, তোমরা একটু ভেবে দেখ।
.
রিতা বলে, তোর সিদ্ধান্ত তোকেই নিতে হবে। তবে তোর এখন বিয়ে করা উচিৎ আমরা এটুকুই বুঝি।
.
বকুল বললো, বিয়ে যেহেতু করতে হবে তাকে আর সময় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তুই তাকে ঢাকায় আসতে বল। আমাদের বাসাতে বিয়ে হবে।
.
মনি বলে, অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে, এবার উঠা যাক। বিয়ের সময় খবর দিবি কিন্তু, আমিও আসবো।
এরপর সবাই বিদায় নিয়ে নিজ নিজ বাসায় ফেরে।
.
শিরিন বাসায় এসে ফ্রেস হয়ে এবার আর চ্যাটিং-এ না বসে সরাসরি দিনার খানের নম্বরে কল দেয়। দিনার তার মোবাইল স্ক্রীনে শিরিনের কল দেখে চমকে উঠে। ভাবছে, শিরিন তো আমাকে মোবাইল কল দেওয়ার কথা নয়। চ্যাটিং এ কেবল কথা হয়ে আসছে। নিশ্চয় জরুরী কোন সমস্যায় পড়েছে, তাই সরাসরি কল দিয়েছে মনে হয়।
.
-হ্যালো শিরিন কেমন আছ ? তোমার কল পেয়ে আমার বুকটা কেমন যেন ধরপড় করছে।
.
-কেন ? এত নার্ভাস হওয়ার এমন কী আছে !
.
-তুমি তো কখনো কল দাও নি, তাছাড়া আমাকেও নিষেধ করে দিয়েছ কল না দেওয়ার জন্য। তাই হঠাৎ এত জরুরী তলব কেন ?
.
-জরুরী তলব না, তোমার মোবাইল সব সময় চার্জ ভরিয়ে রাখবে এবং সারাক্ষণ সাথে রাখবে। এখন থেকে আর চ্যাটিং করা তেমন হবে না। মোবাইলে কথা হবে। তবে তুমি কল দিতে পারবে না, এটা আমার জোরালো অনুরোধ।
.
-শুধু তুমিই দেবে আমি দেব না ?
.
– আমিই দেব। তোমার খুব বেশি প্রয়োজন হলে বড় জোর ছোট করে মিসকল দেবে। আমি ফ্রি থাকলে কল ব্যাক দেব। কী করছো এখন ? খাবার খেয়েছো ?
.
-খেয়েছি।
.
-আমাকে রেখে খেতে পারলে ?
.
-দোয়া কর যেন তোমাকে নিয়ে প্রতিদিন একসাথে একপ্লেটে খেতে পারি। সেই দিনের অপেক্ষায় আছি। বলতে পার, কবে আসবে সেই দিন ?
.
-সেটা তুমিই ভাল জান।
.
-তুমি বললে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে, রাজি ?
.
-করোনার মহামারির মধ্যে বিয়ে করবে !
.
-আর যদি বল, আমাদের সম্পর্ক আরো গাড় হোক তাতেও আপত্তি নেই। সবই তোমার ইচ্ছে।
.
-তুমি কি আমাকে এতই ভালোবাসো ?
.
-এখনো আমাকে সন্দেহ করছো ?
.
-সন্দেহ না, জিজ্ঞেস করছি।
.
-বরং আমি তোমাকে সন্দেহ করছি। কারন বিশ্বাস করার মত কাজ তুমি করতে পার নি।
.
-আমাকে সন্দেহ ! ঠিক আছে তোমার সন্দেহ থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করার দরকার নেই। ভালো থাকো….সন্দেহ দিয়ে আর যাই হোক সম্পর্ক হয় না।
.
-এই তো, এখনিই তুমি আবারও সন্দেহের প্রমান রাখলে।
.
-তোমার সন্দেহ দূর করার ইচ্ছে আমার নেই। যখন থাকবো না তখন বুঝবে।  সন্দেহ দিয়ে সম্পর্ক হয় না।
.
-আমি চাই তুমি চিরদিন আমার হয়ে পাশে থাকবে।
.
-পাশে থাকার কী দরকার ? আমাকে তো সন্দেহ করছ।
.
-প্রতিদিন যদি দুই তিন বার রাগ কর,  তোমার রাগ ভাংগতে আমার সময় চলে যায়। কই আমি তো একবারও রাগ করি নি। আমি যে তোমাকে বিশ্বাস করেছি সেই প্রমান আমি সব সময় দিয়ে যাচ্ছি।
.
-আমি চাই তুমিও রাগ করো। তুমি রাগের কথা বলবে আর আমি রাগ করবো না ?
.
-কেন আমি তোমার প্রতি রাগ করবো? ভালবাসার মানুষের ওপর রাগ করা যায় না।
.
-আমাকে সন্দেহ হলে আমাকে গালি দাও, বলো ছলনাময়ী, বিশ্বাসঘাতিনী। সন্দেহ হলে কেউ কী তাকে গিফট দেয় ?
.
-আমি যে তোমাকে বিশ্বাস করেছি সেই প্রমান আমি বার বার রেখেছি। তুমি বলাতে আমি সন্দেহের বিষয়টি বলেছি। তোমার সাথে এযাবত প্রায় পঁচিশ হাজার শব্দের চ্যাট হয়েছে। কখনো সন্দেহ হয়েছে এমন কোন শব্দ বা বাক্য দেখাতে পারবে ? পারবে না। বরং প্রতিদিন তুমি আমাকে বিদায়/ডিলেট/কথা বলব না, আমি ছেলে এসব বলে বলে ভয় দেখাও। আমি তো একদিনও এমন করি নি। কারন আমি তোমাকে খুব ভালবাসি। তুমি রাগ করলে আমি যে খুব কষ্ট পাই, এটা তুমি বুঝ না ?
.
-তোমাকে আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি বানাতে চাই। তাই তোমার প্রতি আমি বার বার রাগ দেখাই। বুঝতে পারলে ভাল, না বুঝলে কচু ! আচ্ছা শুন, তর্ক করলে সারা রাতেও শেষ হবে না। বিদায় নিচ্ছি।
.
-এখনই শুয়ে যাবে ? রাতের প্রেমালাপের আলাদা মজা।
.
-শরীর খারাপ, জ্বর ও মাথা ব্যথা বাড়ছে। শুয়ে যাব। তারপরেও যদি বলো তাহলে নেটে থাকবো।
.
-হায় আল্লাহ। কী শুনালে তুমি !
.
শিরিন মোবাইল কল কেটে দিয়ে দু’টো সাদা কাগজের টুকরো নেয়। সুঁই দিয়ে হাতের আঙ্গুল ছিদ্র করে রক্ত বের করে একটিতে লিখে আই লাভ ইউ, অপরটিতে লিখে আই লাভ দিনু। এরপর কাগজ দু’টোর ছবি তুলে দিনারের ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে দেয়। দিনার ঘুমিয়ে পড়ায় এরপর আর ম্যাসেঞ্জার দেখা হয় নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে শিরিন দিনারকে কল দেয়। রিংটোনের আওয়াজে তার ঘুম ভাঙ্গে। পাশের টেবিল থেকে মোবাইল টেনে নিয়ে দেখে শিরিনের কল।
.
-তুমি এখনো ঘুমিয়ে ছিলে ? নয়টা বাজছে কিন্তু।
.
-আগে বল তুমি কেমন আছ ?
.
-ভাল নেই। জ্বর ও মাথা ব্যথা। এখন কিছুটা কমেছে।
.
-আচ্ছা শিরিন, আমাদের সম্পর্ক এতদিন গড়িয়েছে। কখনো আগ বাড়িয়ে তোমার ব্যক্তিগত কোন বিষয় জানতে চাই নি।
.
-কেন চাও নি?
.
-তুমি মাইন্ড করবে তাই। আজ আমার জানতে ইচ্ছে করছে, বলবে আমায় ?
.
-বল কী জানতে চাও ?
.
– ঢাকায় যখন তোমার সাথে দেখা হয়েছিল তখন তুমি গাড়ীর ড্রাইভিং সিটে বসে আমাকে বলেছিলে, পাঁচ বছর আগে আমি চরম অসুস্থ হয়ে পড়ি। বাবা মামনি আমার একমাত্র ছোট দু’ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর থেকে ঢাকায় আসছিলেন। থাক, আর বলতে পারছি না। সে গল্পটা মনে পড়লে আমি অস্থির হয়ে যাই। এটুকু বলে আর বলতে পার নি। কী হয়েছিল সেই দিন ?
.
-সেই দিন সুস্থ থাকার পরও বলতে পারি নি, আজ অসুস্থ শরীর নিয়ে বলতে পারব !
.
-থাক না হয়। তোমার কষ্টের মাঝে আরও কষ্ট বাড়াতে চাই না।
.
-না বললে তুমি হয়তো কখনো জানতে পারবে না। কষ্ট হলেও বলে রাখছি, বাবা মামনি আমার ছোট দু’ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর থেকে ঢাকায় আসছিলেন। আসার পথে উনাদের মাইক্রোটিকে চাপা দিয়ে চলে যায় দানব আকৃতির একটি লরি। মা বাবা ও দুই ভাইকে পিষে চলে যায়। একটা লাশও অবিকৃত অবস্থায় উদ্ধার করা যায় নি। খোদার এ নিষ্ঠুরতার মাঝেও কী রহমত পড়েছে, আমার যমজ বোন নরিন সেদিন আমার কাছে থাকায় সে রয়ে গেছে। নচেৎ এ পৃথিবীতে আমি একা হয়ে যেতাম। দুর্ঘটনা যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। ছয় মাস পর বোনটির স্বামীও মারা যায়। এর পর সে এখন বাবার সম্পত্তিগুলো দেখাশুনা করছে। দিনাজপুর শহরে আমাদের একটি তিন তলা বাড়ি রয়েছে। বাসা ভাড়ার আয় দিয়ে নরিনের জীবন-জীবিকা চলছে।
.
শিরিন ও দিনারের কথোপকথন যেন কুয়াশার চাদরে ঢেকে গিয়ে ক্ষিছুক্ষণ ছন্দপতন ঘটে। দিনারের চোখ দুটো যেন ঝাপসা হয়ে আসে। শিরিনে চোখের ভিতর থেকে পানির স্রোত এগিয়ে আসে।  চোখের জলে ভিজে যায় শিরিনের মাথায় দেওয়া বালিশটি। শিরিনের নীরব কান্নার মৃদু শব্দ শুনে দিনারের অজানা সহানুভূতিগুলো আরো বেড়ে যায়। শিরিনকে সান্তনা দেয়:
.
-কেঁদো না প্রিয়া সবই সৃষ্টিকর্তার লীলাখেলা। আমি তো সব সময় তোমার পাশে আছি। আমাকে তোমার পরিবারের একজন হিতাকাংখী হিসেবে গ্রহন করে নাও। জীবনের নি:শ্বাস থাকা পর্যন্ত আমি তোমার মনের ভেতর চেপে থাকা সব দু:খ কষ্ট ঘুচিয়ে দেব, তোমাকে ফিরিয়ে দেব নতুন এক জীবন।
.
-যাদেরকে হারিয়েছি তাদের জীবন তুমি কখনো ফিরিয়ে দিতে পারবে ? জানি পারবে না।
.
-তা হয়তো পারবো না, কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনা ভুলিয়ে রাখতে পারবো।
.
-ঠিক আছে, আগে শরীরটা খারাপ ছিল, এখন পুরনো স্মৃতিগুলো টেনে এনে মনটাও খারাপ হয়ে গেল। আমি রেস্ট নিতে চাই। তোমার ম্যাসেঞ্জারে দু’টো পিক পাঠিয়েছি, ওগুলো দেখে নিও। রাতে শরীর ভাল থাকলে চ্যাটে আসব। রাখলাম ।
.
কল সমাপ্তির পর দিনার চ্যাট খুলে রক্ত দিয়ে লেখা কাগজ দু’টো দেখে চমকে উঠে। মনে মনে ভাবে, এসব তো টিন এইজেড প্রেমিক প্রেমিকরা করে। এ বয়সে শিরিন এমন করতে পারল ! আমার প্রতি তার ভালবাসা এতদিন আমার কাছে কেমন যেন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। প্রতিদিন সে আমাকে ঠুনকো বিষয় নিয়ে কেটে পড়ার হুমকি দিয়ে আসছে । তার প্রতিনিয়ত হুমকিতে আমার কাছে মনে হতো আমার প্রতি তার ভালবাসা যেন কচু পাতার পানি, যে কোন সময় ঝরে পড়তে পারে ! ‘’প্রেম ভালবাসাকে যত ঝাঁকানি দেওয়া হয় তত এর ভীত শক্ত হয়’’ তার এ কথাটি আজ সত্য প্রমানিত হলো। শিরিন তাহলে আমাকে সত্যি সত্যিই প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ শিরিনের ফোন:
.
-পিক দু’টো দেখেছ ?
.
-দেখলাম তো। আগে বল তোমার শরীর কেমন ?
.
-মোটামুটি ভাল। পিক দেখে কী বুঝলে ?
.
-এগুলো রক্ত দিয়ে লিখেছ ? নাকি লাল রং দিয়ে লিখেছ ?
.
দিনারের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত মন্তব্য শুনে শিরিনের মাথায় যেন হঠাৎ রক্ত জমাট বেঁধে যায়। চোখ দু’টো যেন এক লাফে কপালে চড়ে বসে।
.
-তুমি কী করে বললে ওটা রং দিয়ে লেখা ? শুনো, এ মুহূর্তে তোমার সাথে কথা বলার মুড চলে গেছে। তুমি আমার ভালোবাসাকে অবমূল্যায়ন করেছো। ওটা আমার শরীরের রক্ত ছিলো। সুঁই দিয়ে তর্জনী ছিদ্র করে লেখা। জানতাম তুমি এমন বলবে কারন আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা ছিল ফেইক ! তুমি আমার সাথে আর কখনো যোগাযোগ করবে না বলে দিলাম।
.
-কেন কী হয়েছে আবার ? হঠাৎ মাথায় ঝড় বয়ে গেল কেন। কী করেছি আমি ?
.
-বাদ দাও, তোমাকে এসব বলে লাভ নেই। তুমি অন্যের ইমোশন কে কখনো সম্মান করতে পারবে না।
.
-প্লিজ, আমাকে ভয় দেখিও না, সাহস দিও। শিখিয়ে দিও, বোকা বানিও না। বুঝিয়ে দিও রাগ করো না। ভুল করলে ক্ষমা করে দিও, দূরে ঠেলে দিও না। এটাই হচ্ছে প্রকৃত ভালবাসা।
.
-তাই বলে রক্তকে  রং বলে খাট করবে ? যে বুঝতে পারে না তার সাথে আমার চিরদিনের আড়ি। বিদায় নিচ্ছি, ভাল থেকো।
.
শিরিন কল কেটে দিয়ে মোবাইলও শার্টডাউন করে দেয়। দিনার নেটে গিয়ে শিরিনের উদ্দেশ্যে ম্যাসেজ পাঠায় :
-কল কেটে দিয়ে চলে গেলে কেন ?
x-রক্ত দিয়ে ভালবাসতে পেরেছো, দেখে আনন্দিত হলাম। আমার প্রতি তোমার ভালবাসাটা এতদিন লুকিয়ে রেখেছ কেন তাহলে ?
x প্রতিদিনই তুমি চাচ্ছ ঠুনকো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করে আমাকে বিদায় করে দিতে। আমি যেন রাগ করে চলে যাই। কিন্তু আমি কখনো রাগ করি নাই, করবও না। কারন আমি তোমায় প্রচন্ড ভালবাসি।
x বিশ্বাস স্থাপনের মত এমন কোন কাজ কর নি তুমি।
x তবুও আমি তোমাকে অন্ধভাবে ভালবেসেছি । এখনো আমি যেন মরিচিকার পিছনে দৌঁড়াচ্ছি। এতে তুমি সুখ পাচ্ছ ? সুখ পেলে তাহলে কীসের ভালবাসা !
xভালবাসার মানুষকে কখনো প্রতিদিন বিদায় দেওয়া যায় না। ভুল হলে শোধরে নেওয়ার চেষ্টা করবে। তাও কর নি কখনো। শুধু ঝাঁকানিই দিয়ে যাচ্ছ ঠুনকো অজুহাতে। তবুও আমি তোমার পাশ থেকে সরে যাই নি। আটার মত লেগেই ছিলাম।
x হয়তো আমার মন থেকে ভুল একটা মন্তব্য ফসকে বের হয়ে গেছে। এটাই হয়তো প্রথম।
x আমার এক ঝাঁকানি তুমি সইতে পার নি, অথচ আমি তোমার প্রতিদিনই ঝাঁকানি খাচ্ছি।
x এতে ভালবাসায় খাদ কোথায় তা বুঝতে কারো কষ্ট হয় ?
x আজ এক ঝাঁকানিতে তুমি আমার ভালবাসাকে ফেইক বলতে পারলে ?
.
দিনার খান এক নাগাড়ে লিখে যাচ্ছে, ওপাশ থেকে কোন জবাব আসছে না দেখে শিরিনের নামের পাশে সবুজ আলোর দিকে লক্ষ করে । সবুজ আলো জ্বলছে না। চ্যাটগুলোও সিন হয় নি। শিরিন তাহলে বিদায় নিয়ে চলেই গেল। বার বারই চলে যাচ্ছে পরে আবার নিজ থেকে ফিরেও আসছে। দিনার চিন্তায় পড়ে গেল,  ভাবছে, আসলে রক্তকে রং বলা উচিৎ হয় নি। ক্ষমা চাইলাম, তবুও চলে গেল ! ও আসলেই একটা জেদী মেয়ে। প্রতিদিনই সে জেদ ধরে। তার এ জেদ ভালবাসার পথের কাঁটা নয়, ভালবাসার ভীত শক্ত করার জেদ যা আমি কখনো বুঝতে পারি নি। শিরিন আজ চরম ক্ষোভে আমার মোবাইল নম্বরটিও ব্লক করে রাখে। ভালবাসার মানুষকে ভুলে যাওয়া এতোই সহজ ? নিশ্চয়ই সে একদিন ফিরে আসবে।
.
দুই দিন গেল, পঞ্চম দিনও গেলে, দশম দিনও চলে গেল। শিরিন আর ফিরে আসছে না। সে সামান্য বিষয়কে বড় করে দেখে মাইন্ড করতে পারল ? সত্যি সত্যিই আমাকে চিরদিনের জন্য আড়ি দিয়ে চলে গেল ! প্রেমোলজিস্ট স্যার আমাকে বলেছিলেন, ‘’ছেলেদের মগজ অনেকটা ঘড়ির কাঁটার মতো, মেয়েরা ইচ্ছে করলেই ঘুরিয়ে দিতে পারে আবার সামনের দিকেও এগিয়ে নিতে পারে। একজন মায়ের ২০ বছর সময় লাগে তার ছেলেকে যুবক-এ পরিণত করতে, কিন্তু সেই যুবককে গাধায় পরিণত করতে একজন যুবতীর লাগে মাত্র পাঁচ মিনিট’’ ! শিরিন তাহলে আমাকে গাধা বানিয়েই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে’’ ! প্রেমোলজিস্ট জাহিদ স্যার এও বলেছিলেন, ‘’ধৈর্য ধরে নিজেকে স্থির রেখে তার আবেগকে প্রধান্য দিতে হবে। সে যেভাবে চাইবে আপনি তাতে দ্বিমত পোষণ করবেন না। তার সাথে আগ বাড়িয়ে কখনো ফালতু কথা বলবেন না। আর তার ব্যক্তিগত বিষয়ে আগবাড়িয়ে কোন প্রশ্ন করতে যাবেন না’’। উনার কথাগুলো খুবই মূল্যবান। আমি উনার নির্দেশ মতে চলতে পারি নি। তাই আজ আমার প্রেম-ভালবাসায় বিরহের সুর বাজছে !
.
পনের দিন পর হঠাৎ শিরিনের ফোন। দিনার স্ক্রীনে কলারের নাম দেখে আনন্দে শিহরিত হয়ে যায়। কলটি রিসিভ করে দিনার বলে :
-আহারে জান, আমি জানতাম তুমি আবার ফিরে আসবে। তবে এত সময় পর ফিরে আসবে সেটা কখনও ভাবি নি। আমার মনটাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে বার বার ছাঁই করে মজা নিচ্ছ কেন ?
.
-তোমাকে ভুলে থাকতে পারি নি। গত পনের দিন যেন পনেরটা বছর পার করেছি। কেমন ছিলে ?
.
-তুমি যেমন রেখেছ ? তোমার রাগ ভেঙ্গেছে ?
.
-তোমার এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না। সেটা তুমি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা কর।
.
-প্রতিদিনই তুমি চাচ্ছ ঠুনকো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করে আমাকে বিদায় করে দিতে। আমি যেন রাগ করে চলে যাই। কিন্তু আমি কখনো রাগ করবো না। কারন আমি তোমায় ভালবাসী।
.
-শুন, আমি আজকে থেকে কিছুদিনের জন্য বিশ্রামে যাবো তোমার সাথে হয়তো কিছুদিন কথা হবে না। শরীর ঠিক হলে আবার নিয়মিত হব। ড্রাইভার, বুয়া সবাইকে আগামী ২মাসের বেতন দিয়ে ছুটি দিয়ে দিলাম। প্লিজ ওয়েট বড় স্যার, কল দিয়েছে।
.
তিন মিনিট পর:
-হ্যালো, লাইনে আছ ?
.
-হ্যাঁ আছি, বড় স্যারে কী বলেছেন ?
.
-উনি বলেছেন, এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়েছি, তুমি রেডি হয়ে নাও।
.
-এ্যাম্বুলেন্স কেন ?
.
– আমি মনে হয় আর বাঁচব না।
.
-কেন বড় ধরনের সিরিয়াস অসুস্থ তুমি ?
.
-তুমি আমার কন্ঠ শুনে কিছুই বুঝ না ?
.
– কোন একটা সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হয়, যেন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে হয়রান হয়ে গেছ।
.
-অনেকটা তাই। আবারও জ্বর, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। গলায় একটু একটু ব্যথাও আছে।
.
-করোনা টেষ্ট করাও নি।
.
-করিয়েছি, আজ রিপোর্ট পেয়েছি। রিপোর্ট পজেটিভ , দোয়া কর যেন সুস্থ হয়ে উঠি।
.
-আমার কিন্তু কান্না আসছে। আমি সুরক্ষা নিয়ে চলে আসি ?
.
-ঝুঁকি নিয়ে তোমাক আসতে হবে না। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যে শুরু হয়ে গেছে এটা তুমি জান না ?
.
-আমি করোনা-টরোনা বুঝি না। আমি আসবোই। তোমার এ দু:সময়ে আমি আসবো না কেন ?
.
-যদি কারো সহযোগিতার প্রয়োজন হয় তবে আমার একমাত্র যমোজ বোন নরিনকে খবর দিয়ে নিয়ে আসবো। সে এখন গ্রামের বাড়িতে। তাকে  জানানোর মত অসুস্থ এখনো হই নি। তাছাড়া আমি গত দুই দিনের চেয়ে কিছুটা ভাল। তবে বড় স্যার আমাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে ভর্তি হতে বলেছেন। কিছুক্ষণ পর হয়তো এ্যাম্বুলেন্স আসবে আমাকে নিয়ে যেতে। দোয়া করবে।
.
-আমি রিজার্ভ মাইক্রো ভাড়া নিয়ে আসবো। তবুও আমাকে আসার অনুমতি দাও। তখন দেখবে আমার সেবা যত্নে তুমি অর্ধেক ভাল হয়ে যাবে।
.
-তোমার কথা শুনে মনে হল তুমি আমাকে শেষ বিদায় দিতে চাও। তোমার উৎকন্ঠা দেখে মনে হচ্ছে আমি চলে গেলে তুমি খুব খুশি হবে….।
.
-ছি: ছি: এসব কী বলছো ! মরবে কেন, দ্রুত সেরে উঠবে ইনশাল্লাহ। তোমার পাশে স্বজনদের মধ্যে কেউ নেই। তাই এ মুহূর্তে আমি তোমার পাশে থাকলে ভাল হতো।
.
-পাগলামো করবে না।  শান্ত হও, তুমি এভাবে করলে আমি আরও ভেঙে পড়বো। তুমি আসবে না। সেবা করার মত খালা আছে, বোনকে খবর দিলে সেও আসবে। তোমার কথা শুনে মনে হল আমি মরে যাবো।
.
-আমি চলে আসবো। সুরক্ষা নিয়ে গাড়িতে উঠব।
.
-পাগলামো করবে না। শান্ত হও, তুমি এভাবে করলে আমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বো।
.
-ওকে, দোয়া করি যেন সুস্থ হয়ে উঠ।
.
-এ্যাম্বুলেন্স এসে গেল। আমাকে এক্ষুনি উঠতে হচ্ছে। আমি এখন বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে যাবো। তোমাকে আবারো বলছি তোমার ঢাকায় আসার কোনো দরকার নেই । তোমার শরীরের যত্ন নিও। আমার জন্য দোয়া করবে। মরে গেলে ক্ষমা করে দিও। বাই
.
শিরিন কল কেটে দেয়। দিনারের দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে যায়। চাপা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। তার চোখমুখ যেন ঢেকে যায় ঘন কুয়াশায়। কুয়াশার চাদর ভেদ করে সে ভাবনার মাঝে শিরিনকে খোঁজার চেষ্টা করে। এ মহামারীর মৃত্যু যমদূত থেকে শিরিন কী কখনো ফিরে আসতে পারবে ? তাই বলে কী চুপ মেরে বসে থাকবো ? ফিরিয়ে নেব মুখ ? কখনোই নয়! শিরিনকে আমি প্রচণ্ড ভালোবেসে ফেলেছি । এসব ভাবতে ভাবতে সেদিনই সে সিদ্ধান্ত নেয়, যা হয় হবে প্রিয়তমার শেষ দিনগুলো সে তার পাশে থেকে সেবা-যত্ন দিয়ে ভরিয়ে দেবে। তাই পরদিন সে ঢাকায়  বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে পৌঁছে। সংক্রমণ রোধে প্রিয়জন থেকে দূরে থাকা,সংক্রমণের ভয়, প্রিয়জনের মৃত্যু এসবকে উপেক্ষা করে অনেক অনুনয়-বিনয় করে হাসপাতালের পরিচালকের অনুমতি নেয় ও সংক্রমণরোধী পোশাক, গ্লাভস, ফেসমাস্কসহ  সুরক্ষার সব ব্যবস্থা নিয়ে শিরিনের কেবিনে প্রবেশ করে দিনার। শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে দেখে সে  শিরিনে হাত ধরে বলে, আমাকে চিনতে পেরেছ ? আমি তোমারই দিনু। শিরিন এক পলক তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। দিনার মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে আবারও মুখের কাছে গিয়ে শিরিনের দৃষ্টি আকর্ষণে চেষ্টা করে বলে, এবার দেখ আমাকে চিনতে ফেরেছ কিনা !
.
-তুমি কেন এলে এই প্রাণঘাতী রোগির সংস্পর্শে ?
.
কিছু বলে না দিনু, কেবল চোখ বেয়ে কয় ফোটা পানি ঝরিয়ে প্রেম, ভালবাসা ও হৃদয়ের সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে প্রিয়তমার দিকে। হয়তো প্রিয়তমা বুঝতে পেরেছে দিনুর সেই দৃষ্টি ও চোখ থেকে ঝরে পড়া পানির ভাষা।
.
শিরিন তার চাপা কান্না আড়াল করতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠে। হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে পাশে বসায়। শ্বাস কষ্ট  থাকায় কথা বলতে একটু কষ্ট হলেও মৃদুস্বরে শিরিন বলে, তুমি কেন এসেছ ? আমি তো চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাচ্ছি।
.
প্রিয়তমা তখনও বিছানায় কাতরাচ্ছে। সেখান থেকে তার হয়তো কখনোই আর সুস্থ হয়ে ফেরা হবে না। দিনু তাকে সান্তনা দেয়, প্লিজ তুমি ভেঙ্গে পড়বে না, অবশ্যই তুমি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যাবে। মনোবল দৃঢ় কর, মনোবলই এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা।
.
শিরিন বলে, তুমি সত্যি সত্যিই আমাকে ভালবাস ?
.
-ভালই যদি না বাসি তাহলে যে রোগীর সেবায় আপনজন কেউ কাছে থাকে না, স্বামী তার স্ত্রীর কাছে আর স্ত্রী তার স্বামীর কাছে যায় না, খানা এগিয়ে দেওয়া হয় লাঠির মাথায় বেঁধে, জানাজায়ও কেউ যায় না সে রোগীর সেবায় কেন আমি সেচ্ছায় এলাম ! আমি এখানে এলাম প্রায় আধা ঘন্টা হয়ে গেল, ওয়ার্ডবয়, নার্স, ডাক্তার কাউকে তো এখনো তোমার পাশে দেখছি না। বুঝে নাও আমি তোমাকে কতটুকু ভালবাসতে পারলে নিজ জীবনের ওপর চ্যালেঞ্জ ঠুকে দিয়ে এখানে এসেছি।
.
-তোমাকে আমার জীবন সায়াহ্নে একটা অনুরোধ করবো, রাখবে তুমি ?
.
-সম্ভব হলে অবশ্যই রাখবো।
.
-অসম্ভব এমন কোন অনুরোধ করবো না। রাখবে কিনা বল ?
.
-বল তুমি, রাখবো।
.
-তুমি এ মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও। তোমাকে বেঁচে থাকা লাগবে। আমি চাই না তুমিও মারা যাও।
.
-তোমার এ অনুরোধ আমি কিছুতেই রাখতে পারবো না। আমি তোমাকে সুস্থ করেই একসাথে এ হাসপাতাল থেকে বের হবো।
.
-আর যদি সুস্থ না হয়ে মারা যাই ?
.
-তাহলে তোমার লাশ কাঁধে নিয়ে বের হবো।
.
-পাগলামো করো না প্লিজ। তোমাকে শুধু আমার জন্য নয়, আমি হয়তো মরে যাব, তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে তোমার পরিবারের জন্য।
.
-ওইসব চিন্তা তোমাকে করতে হবে না।
.
-আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, ওই গ্লাসটা নিয়ে পানি দাও।
.
দিনার ওয়াটার হিটারে পানি হালকা গরম করে নেয়, গ্লাসটি ধুয়ে পানি ভরে শিরিনের পাশে বসে মাথার নিচে বাম হাত দিয়ে মাথা উপরে তুলে নিয়ে গ্লাসটি মুখে তুলে দেয়। পানি খেয়ে শিরিন বলে, এখানে আসার পর তোমার হাতে এ এক গ্লাস পানি যেন তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। এখানের কোন খাওয়াতে আমার মুখে রুচি আসছে না। তাই খেতেও পারছি না।
.
-রুচি আসবে, খেতেও পারবে যদি আমি খাইয়ে দিই এ কথা বলে দিনার টেবিলে থাকা লাঞ্চ পেকেট খুলে প্লেটে নিয়ে শিরিনের পাশে বসে।
.
-আমার হাতে দাও, হাত ধোয়ার পানিটাও দাও। আমি নিজেই খেতে পারবো যদিও খাওয়াতে কোন রুচি নেই।
.
-তোমাকে হাত ধুতে হবে না, আমিই খাইয়ে দেব।
.
দিনার বেসিনে গিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিজ হাতে শিরিনের মুখে একটা পর একটা লোকমা তুলে দেয়। সে তৃপ্তিসহকারে পুরো প্লেটের ভাত খেয়ে নেয়। টিস্যু দিয়ে মুখ মুচে তাকে পানি ও ঔষধ খাইয়ে দেয়। শিরিনের দু’চোখের কোনায় পানি জমেছে। দু’ফোটা লোনা জল কিছুটা নেমে এসে মুখের দু’পাশে আটকে যায়। দিনার টিস্যু দিয়ে চোখ মুখ মুছে দিয়ে বলে, কান্না করছো কেন ? আমি তোমার পাশে আছি।
.
-আমার এ কান্না একদিকে আনন্দের, অপর দিকে হৃদয় ভাঙ্গার কান্না। তোমার আন্তরিকতা ও ভালবাসা আমার হৃদয়কে যেন নাড়িয়ে দিয়েছে। আমি জানি, আমাকে হয়তো কয়দিন পরে পৃথিবীর মায়া, তোমার নি:স্বার্থভালবাসা  ত্যাগ করে বিদায় নিতে হবে। তুমি তোমার জীবনের মায়া ত্যাগ করে করোনা রোগীকে সেবা দিয়ে আমাকে ঋনী করে দিয়েছ, আমি তোমার সেই ঋণ শোধ না করে মরতে চাই না। নকুল কুমারের ‘’ স্বার্থ ছাড়া বন্ধু-বান্ধব কাছে আসে না, স্বার্থ ছাড়া ভালবাসেন শুধু আমার মা’’ গানটি মিথ্যা প্রমান করে দিয়েছ তুমি। তোমার এ ভালবাসার মূল্য আমি কীভাবে শোধ করবো যে সুযোগ খোদা আমাকে দেবে কিনা জানি না।
.
-এভাবে বলে তুমি আমাকে লজ্জা দিচ্ছ কেন ?
.
-তোমাকে আমি আরও একটা ইচ্ছে জানাবো, পূরণ করবে তুমি ?
.
-আমি তোমার কোন ইচ্ছাকে অসন্মান করি নি, করবও না, বল তুমি ?
.
-আমি হয়তো বাঁচব না, তবে মৃত্যুর আগ মুহূর্তে আমি তোমার বউ হয়ে মরতে চাই।
.
-আগে তুমি সুস্থ হয়ে নাও। তারপর বউ হওয়ার চিন্তা করিও।
.
-আমার মন বলছে, আমাকে এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হবে। যাওয়ার আগে তোমার বউ হয়ে মরতে পারলে করোনার বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত আমার এ ফুসফুস ও আত্মাটা শান্তি পাবে। প্লিজ, দ্বিমত করো না। প্লিজ !
.
শিরিনের দু’চোখ বেয়ে অশ্রুজলের বন্যা বয়ে যায়। দিনার টিস্যু দিয়ে আবারও তার চোখ-মুখ মুচে দেয়। এ সময় তার চোখ থেকেও দু’ফোটা অশ্রুজল শিরিনের মুখের ওপর পড়ে। সিনিয়র নার্স কবিতা কিছুক্ষণ আগ থেকে দরজার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের ভালবাসার অভিপ্রায়  শুনে ও দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। নার্স গলা খাকারী দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। নার্সকে দেখে দিনার শিরিনের খাট থেকে উঠে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ায়।
.
আমি বিশ মিনিট ধরে আপনাদের কথাগুলো শুনে খুবই আপ্লুত হয়েছি। কবে থেকে আপনাদের এ সম্পর্ক ?
.
শিরিন বলে, প্রায় ছয় মাস থেকে। সিস্টার, আপনি মানবতার সাধক। দু:খি ও অসুস্থ আত্মাকে সুখি করার জন্য আজীবন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমি এখন মৃত্যু শয্যায়, মৃত্যুর আগে আমি আমার ভালবাসার মানুষটির বউ হয়ে মরতে চাই। আপনিই পারবেন আমার মনের সেই আশা টুকু পূরণ করে দিতে।
.
শিরিনের জীবনের শেষ আকুতি শোনার পর নার্স দিনারের মতামত জানতে চান। দিনারের কাছ থেকে মৌন সন্মতি পেয়ে নার্স সিদ্ধান্ত নেন, ওই রাতেই ওই দম্পতির বিবাহের  আয়োজন করবেন। নার্স জানতেন, করোনা রোগীর কেবিনে আইনত তিনি ওই দম্পতিকে বিবাহবন্ধনে বাঁধতে পারবেন না, তবুও এই দম্পতির ইচ্ছাপূরণের জন্যই ছোট পরিসরে ও গোপনে হাসপাতাল মসজিদের ইমাম ও পাশের কাজিকে ডেকে এনে ওয়ার্ডবয়কে সঙ্গে নিয়ে সংক্রমণরোধী পিপিই, গ্লাভস, মাস্কসহ সুরক্ষার সব ব্যবস্থা নিয়ে রাতে বিয়ের পড়ানোর আয়োজন করেন। কাজি দিনারের মুখ থেকে জানতে চান, এ অবস্থায় আপনি উনাকে বৌ হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি কিনা ? সে জবাব দেয়, যে ইচ্ছের মাঝে লুকিয়ে আছে আমার প্রিয়তমার আত্মার শান্তি , সে ইচ্ছে আমি কেন পূরণ করবো না ?  শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘’আই লাভ ইউ, আই লাভ শিরিন, আই লাভ হার লাস্ট উইশ’’। ইমাম ও কাজি বিস্মিত হয়ে একে অন্যের মুখ পানে তাকিয়ে রইলেন।
.
শিরিন বলে উঠে, আপনারা ভাবছেন কেন ? আমার ইচ্ছে টা পূরণ করে দিন প্লিজ। এরপর বিয়ে পড়ানোর কাজ শেষ হলো। নব দম্পতি একে অন্যের হাতে আংটি বদল করে।  ওয়ার্ডবয় অতি গোপনে বিয়ের ভিডিও ধারন করে এবং তা ওই রাতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়। সাথে সাথে এ নিয়ে পুরো হাসপাতাল ও মিডিয়া জগতে হৈ চৈ পড়ে যায়।
.
পরদিন সাংবাদিকরা তাদের সাক্ষাৎকারের জন্য হাসপাতাল গেটে ভিড় জমায়। শিরিনের অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল কর্তপক্ষ ভেতরে ঢুকার অনুমতি দেয় নি। দিনার লেবু, মধু, কালো জিরা ও আদা কেনার জন্য পাশের কাঁচা বাজারে যায়। ঘন্টা খানেক পরে ফিরে এসে শিরিনকে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠে। বলে,
-এই তুমি ভাল না হতে হাঁটাহাঁটি করছো কেন ? খাটে যাও প্লিজ, এখনো তুমি অসুস্থ।
.
-কে আপনি ? হাসপাতালের কেউ ?
.
-প্রিয়তমা, তুমি সামান্য একটু না হয় সুস্থ হলে, এরই মধ্যে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেললে ?
.
-কেন আমার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে ? আবোল তাবোল এসব কী বলছেন আপনি ?
.
-তোমার জন্য লেবু আদা ও মশল্লা আনতে বাজারে গেলাম। এক ঘন্টাও হয় নি। মুহূর্তে আমাকে ভুলে যেতে পারলে ? কেন তুমি আমাকে চিনতে পারছো না ?
.
প্রিয়তমাকে জড়িয়ে ধরে সে খাটে নিয়ে যেতে চেষ্টা করলে সে আরো রাগান্বিত হয়ে যায়।
.
-এডিয়ট বেয়াদপ, গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন ? কে আপনি ?
.
-আমি তোমার স্বামী দিনু, চিনতে পারছো না কেন ?
.
মহিলাটি সাহায্য নিতে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে না দেখে ভেতরে গিয়ে খাটের পাশের পর্দা টেনে শিরিনকে বলে, এই তুই দেখ তো এ বেয়াদপটা কে ? আমাকে জড়িয়ে ধরে স্বামী দাবি করে টানাহেঁচড়া করছে ?
.
শিরিন পাশ ফিরে তাকিয়ে তার তর্জনী আঙ্গুলটা ঠোঁটের উপর চেপে ধরে মৃদুস্বরে বলে,
-চুপ ! চুপ ! এ তোর দুলাভাই।
.
– দুলাভাই ? কেমন দুলাভাই ?
.
দিনার বলে, সরি এবার চিনতে পেরেছি, তুমি নরিন, তাই না ?
.
-হ্যাঁ, আমি শিরিনের যমজ বোন।
.
-তোমার নাম শিরিনের মুখ থেকে অনেক শুনেছি। তোমার মাঝে আমি শিরিনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়ে শিরিন ভেবে আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি। দু:খিত বোন।
.
শিরিন তার বোন নরিনকে কিছু একটা বলতে চেয়েছে। শ্বাস বেড়ে যাওয়ায় বলতে কষ্ট হচ্ছে দেখে দিনার বলে, তোমাকে কথা বলতে হবে না। নরিন তুমি টেবিলের পাশের সোফায় বস। আমি ওপাশের চেয়ারটায় বসছি। ওর রেস্টে থাকা জরুরী।
.
দিনার ও নরিন মুখোমুখি বসে, সে সংক্ষেপে ও ধীরে ধীরে অতীতে শিরিনের সাথে তার কীভাবে পরিচয়, পরিচয় থেকে প্রেম ও সর্বশেষ গতকালের বিয়ের কাহিনীগুলো অনর্গল বলে যায়। নরিন অবাক দৃষ্টিতে পুরো ঘটনা শুনে বলে,
-হায় আল্লাহ ! এখানে এ অবস্থায় বিয়ে ?
.
-হ্যাঁ, আমি তোমার বোনের শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করেছি সিনিয়র নার্স ববিতা আপার আন্তরিক সহযোগিতায়। তুমি এখানে কখন এলে ?
.
-এই তো, আপনার সাথে বাকবিতন্ডা হওয়ার আধা ঘন্টা আগে।
.
এরপর হঠাৎ বাড়তে  থাকে শিরিনের শ্বাসকষ্ট। নরিন ও তার দুলাভাই দ্রুত শিরিনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। শিরিন দু’জনের হাত টেনে তার বুকের ওপর চেপে ধরে ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে দু’জনের মুখপানে তাকিয়ে বলে, আমি মনে হয় আর বাঁচবো না রে। আমি যদি চলে যাই তোরা বাকি জীবনটা একে অন্যের হাত ধরে নতুন আরেক জীবন রচনা করবি। এতে আমি মরে গেলেও আমার মৃত আত্মাটা শান্তি পাবে। দিনুকে বলছি, তুমি নরিনের মাঝে খুঁজে নেবে আরেক শিরিনকে, যার মাঝে ফিরে পাবে আমার প্রতিচ্ছায়া। নরিনকে বলছি, দিনুর মত এমন স্বার্থহীন ও ভালমনের ছেলে কোথায়ও খুঁজে পাবি না। তোমরা আমাকে কথা দাও প্লিজ !
.
নরিন ও দিনার একে অপরের দিকে তাকিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। শিরিন তার বুক থেকে ওদের হাতগুলো উঠিয়ে নিয়ে নরিনের হাতের ওপর দিনুর হাত জুড়িয়ে দিয়ে কেমন যেন ছটফট করতে থাকে, শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে যাওয়ায় চোখ ও নাক থেকে কয়েক ফোটা রক্ত গড়িয়ে পড়ে। দিনার দৌঁড়ে নার্সকে খবর দেয়। নার্স একজন ডাক্তারকে সাথে নিয়ে আসে। ডাক্তার স্টেথেস্কোপ ও অক্সিমিটার দিয়ে  চেক করে শিরিনকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন নার্সকে । তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আইসিইউতে। ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই নিস্তেজ হয়ে যায় শিরিনের দেহ। প্রিয়তমার মৃত্যুর খবর শুনে দিনারের মনের অনুভূতিগুলো দু’চোখের লোনা জলে ভেসে যায়। নরিন দিনারের গলা জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, বাবা-মা, দু’টি ভাইও চলে গেল, আজ আমার একমাত্র বোনটিও আমাকে একা ফেলে চলে গেল। নিষ্ঠুর এ পৃথিবীতে আমিও আর থাকতে চাই না। আমিও চলে যাব বলেই নরিন দিনারের গলা ছেড়ে পাঁচ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে দৌঁড়ে বারান্দায় যায়। গ্রীল থাকায় সে অন্য ফাঁকা জায়গা খুঁজতে এদিক ওদিক তাকায়। দিনার তার পিছু পিছু এসে নরিনকে ঝাপটে ধরে। সে দুলাভাইয়ের ঝাপটা থেকে নিজকে মুক্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, আমাকে মরতে দাও, প্লিজ। এ সময় দুই জন সিকিউরিটি গার্ড দোঁড়ে এসে নরিনকে শাসিয়ে যায়। এরই মধ্যে শিরিনের লাশ ওদের দু’জনের সামনে দিয়ে মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। চার চোখ থেকে যেন লোনা পানির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। দিনার নরিনের বাম হাত কাঁধে নিয়ে জড়িয়ে ধরে লাশের পিছনে পিছনে মর্গের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শিরিন এভাবে চলে যাবে ওরা কখনো ভাবে নি । দিনার নরিনকে সান্তনা দেয়, এভাবে কেঁদো না বোন, এমন কিছু কিছু  দু:সময় সামনে এসে যায়, ওই সময়গুলো দূরদর্শিতার সাথে সবাইকে কাটিয়ে উঠতে হয়। যে হারাবার সে হারবেই, মাঝখানে তোমার আমার জীবনটাকে এলোমেলো করে দিয়ে যাবে এটাই হয়তো নিয়তি।
.
কান্না জড়িত কণ্ঠে নরিন বলে, দুলাভাই শুন, আমার বোন কখনও বিয়ে করবে না বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এরপর তোমাকে কেন ভালবেসেছে , মৃত্যু শয্যায় আবার তোমার বউ হয়ে কেন মরতে চেয়েছে এবং  আমাকে কেন তোমার হাতে তুলে দিয়েছে আমি এসবের কিছুই বুঝতে পারছিনা। তোমাদের গল্পের শেষটা খুবই দু:খের হলেও তবে তোমরা সার্থক।
.
-নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলা যে কত কষ্টের আর তাকে হাতের মুঠোতে পেয়েও না পাওয়া যে কি দুঃসহ তা আমি তোমাকে বোঝাতে পারবনা।
.
-আমি জানি শিরিন আর কখনও ফিরে আসবে না। আপার অছিয়ত পূরণে আমি এখন তোমার সাথে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে  চাই, যে স্বপ্নের মাঝে তুমি খুঁজে নেবে শিরিনের ছায়া।
.
-কী জানি,, আমার হয়তো ললাট রেখায় তুমিও নেই। যদি কখনো শুন আমি আর নেই, অবিশ্বাস করোনা। কারন শিরিন ছাড়া বেঁচে থেকেও আমাকে এখন মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করতে হচ্ছে। আমি এখন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি মৃত্যুর যমদূতের পদধ্বনি। হয়তো আমার নিয়তি এটাই। তুমি সুখে থেকো।
.
-আমার দিকে একবার তাকাও, শিরিনের প্রতিচ্ছবি  ও কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছ না এখনও ? ওর মৃত আত্মা বলছে কী জান তুমি ?
.
-কী বলছে ?
.
-“জান আমি আবার ফিরে এসেছি”। সরি, হঠাৎ আমি আবার কীসব পাগলামি শুরু করলাম। লাশের সামনে দাঁড়িয়ে  যা না বলার তাও বলে ফেলছি। এখন চল আমারা বাসায় ফিরে যাই।
.
-লাশের কী হবে ?
.
-তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি এখন শিরিনের প্রতিচ্ছায়া আমাকে নিয়ে ভাবো। সরকারিভাবে ওর লাশ দাপন হবে। চল আমরা বাসায় ফিরে যাই। যাওয়ার আগে আমাদের করোনা টেস্ট করে যেতে হবে। টেস্ট দিয়ে আসি, তারপর বাসায় ফিরে বোনের অছিয়ত কখন কীভাবে পূরণ করা যায় তা নিয়ে ভাববো।
.
-তোমাদের বাসায় যাওয়া আমার ঠিক হবে না, আমি নোয়াখালীতে নিজ বাড়িতে ফিরে যাব। যাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিলাম সে তো এখন নেই।
.
-তোমার সেই স্বপ্নের মানুষটির অছিয়ত তুমি রক্ষা করবে না ? আমার ভালোবাসা তোমাকে অতীত ভুলিয়ে রাখতে পারবে। আবার না হয় নতুন করে ভালোবাসতে শিখ। এতে হয়তো ভুলে যেতে পারবে তোমার সেই ফেলে আসা দিনগুলো।
.
-ভালোবাসা সকলের জন্য উন্মুক্ত, সকলেরই অধিকার আছে ভালোবাসা পাওয়ার ও দেওয়ার। ভালোবাসাতে নেই কোন ধর্ম, বর্ণ, বয়স ও জাতিগত ভেদাভেদ। ভালবাসা পূর্ণতা দেয় মানুষের জীবনকে। অথচ আমি পূর্ণতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছে আবার ছিঁটকে পড়েছি।
.
-তুমি ছিঁটকে পড় নি, তোমার ভালবাসার জয় হয়েছে, তবে সেটা হয়তো টেকে নি। শিরিনকে তোমার হাতে তুলে দিয়ে সৃষ্টিকর্তা আবার কেড়ে নিয়েছে বটে, ডুপ্লিকেট শিরিনকে তোমার জন্যই রেখে গেছে। আমার মাঝে তুমি খুঁজে পাবে শিরিনকে। “ভালবাসা” পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত এবং আলোচিত শব্দ । এই ভালোবাসা কখনও কাঁদায়, কখন হাসায়, কেউ এর জন্য আত্মবিসর্জন দেয়। মানুষ কত ত্যাগ স্বীকার করে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষকে কল্পনায়, আলপনায় ও ছবি বানিয়ে হৃদয়ে ধরে রাখে। তুমি এসব কিছুই করতে হবে না। কারণ ডুপ্লিকেট শিরিন তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
.
-তোমার মাঝে আমি শিরিনকে পাবো ঠিকই, যেহেতু তোমরা যমজ বোন। তাই সব কিছুতেই মিল থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু আমার হৃদয় টা ভেঙ্গে গেল যে !
.
-ভালোবাসা সবার জীবনে একবারই হয় এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বিধাতা শিরিনকে তোমার কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছে ৷ তুমি কখনো একা মনে করো না, আমি আছি তোমার সাথে শিরিনের প্রতিচ্ছায়া হয়ে ৷
.
-নারে বোন, ভালবাসার মানুষটির কখনও বিকল্প হয় না। ভালবাসার জন্ম হয় হৃদয়ে। অনেক সাধনায় দু’টি হৃদয়ের মিলনে এর জন্ম। তুমি এখন বাসায় ফিরে যাও, আমিও বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।
.
দিনার তার মোবাইল নরিনের হাতে দিয়ে বলে, তোমার নম্বরে কল দাও, তুমি আমার মোবাইল নম্বরটা সেভ করে নাও। আমিও সেভ করে নেব। শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক হলে পর কথা হবে, তখন ভাববো কী করা যায় ! ভাল থেকো বোন, বিদায়….
.
বুক ভরা কষ্ট নিয়ে নোয়াখালীতে ফিরে আসে দিনার খান ৷ রয়ে যায় কিছু স্মৃতি হারিয়ে যায় ভালোবাসার মানুষটি ৷ যে মানুষটাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল তা এক নিমেষেই কেড়ে নেয় করোনা মহামারী ৷ করোনার এই মৃত্যুর মিছিলে সামিল হয় তার বার্ধক্য জীবনের শেষ ভালোবাসারও ৷
.
যারা শোক সয়ে নিয়ে স্বাভাবিক হতে পারে, তাদের অন্তরের গভীরে বিরাজ করে নীরব কান্না । সময় যেতে যেতে হয়তো দিনার খানের স্মৃতিগুলো ক্রমে কিছুটা ঘোলাটে হয়ে যাবে। একসময় সে তার কাজের ভিড়ে ধীরে ধীরে ভুলে যাবে শিরিনের কথা। মাঝে মধ্যে যখন ব্যস্ত থাকাটা আর হয়ে ওঠবে না, একাকিত্ব বেড়ে যাবে তখন হয়তো হাজার স্মৃতির ভিড়ে শিরিনের স্মৃতিও কিছুটা মনে পড়ে যাবে। তখন হয়তো চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা নোনা জল বেরিয়ে আসবে।

হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে খালেদা জিয়াকে

করোনা উপসর্গ নিয়ে উপসচিব মারুফ হাসানের ইন্তেকাল

সারাদেশে করোনায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯৪ জনের মৃত্যু

মৃত্যুর মিছিলে ভারত, একদিনে আক্রান্ত ২ লাখ প্রায়

করোনার মৃত্যুর মিছিলে কবর খুঁড়তে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার

বায়তুল মোকাররম উড়িয়ে দিলে দুর্নীতিবাজ কমে যাবে: কাদের মির্জা

হাতিয়ায় কঠিন লকডাউন ভঙ্গ করে ইউএনওর ইফতার পার্টি

সুবর্ণচরে সুইসাইড নোট লিখে স্কুল ছাত্রী আত্মহত্যা

হাতিয়ায় দিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

হাতিয়ায় আওয়ামীলীগ দলীয় চেয়ারম্যানপ্রার্থীর দুই কর্মীকে কুপিয়ে জখম

দ্বিতীয় ডোজ টিকা নিয়েও করোনা আক্রান্ত সাংসদ বাদশা

নোয়াখালীতে ৭৬ মামলায় ১লক্ষ ৫হাজার টাকা জরিমানা

করোনায় মারা গেলেন আবদুল মতিন খসরু

সম্মিলিত শক্তি দিয়ে করোনাকে পরাজিত করতে হবে- কাদের

মামুনুল হকের ‘স্ত্রী’রা নিখোঁজ কেন ?

এই সম্পর্কিত আরো